রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ওলেশকিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে, যেখানে দুর্ভিক্ষের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ডিনিপার নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরটিতে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার বেসামরিক মানুষ আটকা পড়েছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ৪০ জন শিশু রয়েছে। খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে এবং বাইরে বের হওয়ার পথ মাইন ও ড্রোন হামলায় অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। ফলস্বরূপ, শহর থেকে বেসামরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
শহরটির বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা বিভিন্ন বার্তা থেকে সেখানকার খাদ্য সংকটের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। অনেক বাসিন্দা জানিয়েছেন, ঘরে থাকা শেষ খাবার দিয়েই তারা কোনোমতে দিন পার করছেন। কেউ কেউ দিনে মাত্র একবার খাবার খেতে পারছেন। ওলেশকির নির্বাসিত মেয়র তেতিয়ানা হাসানেঙ্কো জানিয়েছেন, আটা, মাংস, তেল, চিনি ও লবণের মতো মৌলিক খাদ্যপণ্যও এখন শহরে নেই। কিছু বাসিন্দা পুরোনো শুকনো পাস্তা, নিজেদের বাড়ির আশপাশে জন্মানো সবজি এবং এমনকি ভোজ্য আগাছা খেয়ে জীবন ধারণ করছেন। একজন বাসিন্দা শেষবারের মতো সামান্য বিট, আলু, পেঁয়াজ, জুচিনি, টমেটো ও বার্লি দিয়ে বোর্শ রান্না করার কথা জানিয়েছেন, যা সেখানকার চরম খাদ্য ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
শুধু খাদ্য নয়, ওলেশকিতে নাগরিক জীবনও প্রায় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে বিদ্যুৎ, প্রবাহমান পানি, গ্যাস ও স্বাস্থ্যসেবা নেই। এমনকি রাস্তায় পড়ে থাকা মরদেহ সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হচ্ছে না, এবং স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অনাহারে থাকা কুকুর কখনো কখনো এসব মরদেহের কাছে চলে যাচ্ছে।
বছরের পর বছর ধরে শহরের বাসিন্দারা সংরক্ষিত খাবার, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফসল এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে আসা খাদ্য সরবরাহের ওপর নির্ভর করে টিকে ছিলেন। তবে চলতি বছর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রাস্তায় মাইন পাতা এবং নিয়মিত ড্রোন হামলার কারণে খাদ্য নিয়ে গাড়ি প্রবেশ কিংবা মানুষকে শহর থেকে বের করে আনা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। খাদ্য সরবরাহের চেষ্টা করতে গিয়ে একটি গাড়ি মাইনে পড়ে কয়েকজন নিহত হওয়ার পর সড়কপথে সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৩ সালে কাখোভকা বাঁধ ধ্বংসের পর ভয়াবহ বন্যায়ও ওলেশকি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, এরপরও শহরের মানুষ কোনোভাবে টিকে ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে মাইন ও ড্রোনের কারণে খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছানো এবং বেসামরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া আরও কঠিন হয়ে গেছে।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা এই সংকটের জন্য রাশিয়াকে দায়ী করেছেন। তাদের অভিযোগ, রুশ বাহিনী শহরের বাসিন্দাদের বের হতে বাধা দিচ্ছে এবং খাদ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা মানুষদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির প্রতি বেসামরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছেন। ইউক্রেনীয় পক্ষ দাবি করেছে যে, মানবিক সহায়তা ড্রোনের আগুনের মধ্য দিয়ে পৌঁছাতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, ক্রেমলিন নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া বক্তব্যে ওলেশকিতে একটি ‘গুরুতর মানবিক বিপর্যয়’ থাকার কথা স্বীকার করলেও এর জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করেছে। রুশ প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভের দাবি, ইউক্রেনীয় বাহিনী মানুষকে শহর থেকে বের হতে বাধা দিচ্ছে এবং খাদ্য ও পানীয় জল সরবরাহে ড্রোন ব্যবহার করে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। ফলে সংকটের দায় নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ বিপরীত।
এর মধ্যেই ইউক্রেন ড্রোনের মাধ্যমে ওলেশকিতে খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। ইউক্রেনীয় বাহিনী সম্প্রতি আবারও ড্রোন ব্যবহার করে শহরে খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী পাঠিয়েছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা বলেছেন, স্থলপথে সরবরাহ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ায় ড্রোনই এখন বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, রুশ বাহিনী ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনেই ওলেশকি দখল করে। একই বছরের নভেম্বরে ইউক্রেনীয় বাহিনী খেরসন শহর পুনর্দখল করলে রুশ সেনারা নদীর ওপারে ওলেশকিতে অবস্থান শক্তিশালী করে। এরপর শহরটি যুদ্ধের সম্মুখসারির একটি এলাকায় পরিণত হয়। ওলেশকির বর্তমান পরিস্থিতি ইউক্রেন যুদ্ধের মানবিক সংকটের একটি ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। প্রায় চার বছর ধরে চলা যুদ্ধের এই পর্যায়ে সামনের সারির একটি শহরে আটকে পড়া সাধারণ মানুষ খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার চরম সংকটে পড়েছেন। যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে কোনো কার্যকর মানবিক করিডোর প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় শহরটির অবশিষ্ট বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া এবং নিয়মিত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে জরুরি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

















