সিলেট টেস্টে তাওহিদ হৃদয়ের অপরাজিত ২৩৬ রানের মহাকাব্যিক ডাবল সেঞ্চুরি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে। নিজের ষষ্ঠ টেস্ট ইনিংসেই এই কীর্তি গড়েন তিনি, যা বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে চতুর্থ ডাবল সেঞ্চুরি এবং প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে নিজের সেঞ্চুরিকে ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপান্তরের ঘটনা। এই ইনিংসটি বাংলাদেশের সেরা টেস্ট ইনিংসগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মিরপুরে আগের টেস্টে দুই ইনিংসেই অসময়ে শট খেলে আউট হওয়ার আক্ষেপ হয়তো তাড়া করেছিল হৃদয়কে। কিন্তু ক্রিকেটের সৌন্দর্যই হলো কালকের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আজ ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করা। হৃদয় সেই সুযোগটি কাজে লাগিয়েছেন অসাধারণভাবে। যখন বাংলাদেশ ২২ রানে ২ উইকেট হারিয়ে গভীর সংকটে ছিল, তখন ব্যাট হাতে মাঠে নেমেছিলেন তিনি। দলের সেই ডুবন্ত নৌকার মতো অবস্থা থেকে তিনি একাই দলকে টেনে তুলেছেন। প্রথম দিন অপরাজিত ২৯ রান নিয়ে মাঠ ছাড়ার পর দ্বিতীয় দিনে তিনি যেন এক মহাকাব্য রচনা করেন।
টেস্টের মেজাজে খেলা হৃদয় সময়ের সাথে সাথে নিজের ব্যাটিংয়ের ধরনে পরিবর্তন এনেছেন। কখনো রক্ষণে অবিচল থেকেছেন, আবার কখনো আক্রমণে দুরন্ত হয়ে উঠেছেন। বল বুঝে খেলেছেন এবং সুযোগ পেলে বাউন্ডারি আদায় করে নিয়েছেন। তার ব্যাটিংয়ের বিবর্তন সংখ্যা দিয়েও বোঝা যায়। প্রথম ৫০ রান করতে তার লেগেছে ১০৯ বল (১৭৮ মিনিট), সেঞ্চুরিতে পৌঁছাতে পরের ৬২ বলে ৮০ মিনিট, দেড়শ করতে আরও ৬৪ বলে ৬৭ মিনিট এবং শেষ পর্যন্ত ডাবল সেঞ্চুরিতে পৌঁছাতে মাত্র ৬৯ বলে ৯০ মিনিট সময় নিয়েছেন। প্রতিবেদন লেখার সময় তিনি ৩৫১ বলে ২৩৬ রানে অপরাজিত ছিলেন।
এই ইনিংসটিকে কেবল রান আর বলের হিসাবে মাপা যাবে না। এর সবচেয়ে সুন্দর গল্পটি লুকিয়ে আছে শেষ দুই ব্যাটসম্যানকে নিয়ে। এক প্রান্তে হৃদয় এবং অন্য প্রান্তে একের পর এক সতীর্থের বিদায়। এমন পরিস্থিতিতেও হৃদয় নিজের মনোযোগ হারাননি। তাসকিন আহমেদ ও তাইজুল ইসলামের মতো সতীর্থদের পাশে ডেকে সাহস জুগিয়েছেন এবং স্ট্রাইক নিজের কাছে চেয়ে নিয়েছেন। শেষ দুই ব্যাটসম্যানের সাথে তিনি ১৭২ রান যোগ করেছেন। কেবল টিকে থাকাই নয়, প্রয়োজনের সময় চার-ছক্কা মেরেছেন এবং প্রতিপক্ষের বোলারদের ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে অনেক ব্যাটসম্যান নিজের ব্যক্তিগত মাইলফলকের কথা ভাবেন, কিন্তু হৃদয় দলের কথা ভেবেছেন। নিজের ডাবল সেঞ্চুরির চেয়ে তখন বাংলাদেশের লিড নেওয়াটাই তার কাছে বড় হয়ে উঠেছিল। মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালের পর বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করা চতুর্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে তিনি নিজের নাম লিখিয়েছেন।
একটা সময় বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের কাছে টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি ছিল প্রায় স্বপ্নের মতো। সেই স্বপ্ন এখন আরও একবার সত্যি হলো। তবে হৃদয়ের এই ইনিংসের গুরুত্ব কেবল ব্যক্তিগত রেকর্ডে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তিনি আগামী প্রজন্মের ক্রিকেটারদের জন্য একটি মানদণ্ড স্থাপন করে গেলেন। বিপর্যয় থেকে দলকে টেনে তোলা, শেষ দুই ব্যাটসম্যানকে নিয়েও লড়াই চালিয়ে যাওয়া এবং নিজের মাইলফলকের চেয়ে দলের প্রয়োজনকে বড় করে দেখার এক অসামান্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি।
এখন প্রশ্ন হলো, সতীর্থরা কি পারবেন এই মহাকাব্যের শেষটা জয় দিয়ে রাঙাতে? হৃদয় তার কাজটা করেছেন। ২২ রানের ধ্বংসস্তূপ থেকে দলকে টেনে এনে লিড এনে দিয়েছেন। এখন তার সতীর্থদের দায়িত্ব এই ইনিংসের মহিমাকে আরও উজ্জ্বল করা। কারণ, কিছু ইনিংস কেবল স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে না, সেগুলো ভবিষ্যতের ক্রিকেটারদের মনে সাহস যোগায়।
হৃদয় আছেন।.সিলেট টেস্ট: আউট হলেন তাসকিন, ২৪২ রানে অপরাজিত থাকলেন হৃদয়.এমন পরিস্থিতিতে অনেক ব্যাটসম্যান নিজের মাইলফলকের কথা ভাবেন।

















