রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত, টেকসই ও রাজনৈতিক সমাধানে বিশ্ব সম্প্রদায় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জোরালো সহযোগিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এই আহ্বান জানান।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা বিষয়টি যেন জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক রাডারে সর্বদা সক্রিয় থাকে এবং অন্য কোনো বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংঘাত বা সংকটের আড়ালে চাপা না পড়ে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যৌথ প্রচেষ্টা ও কার্যকর কূটনীতির মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে দ্রুত মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব রাজনীতির নেতৃস্থানীয় দেশসমূহ এবং জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ সহায়তায় এ সংকটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধান সম্ভব। তবে, সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা ছাড়া কেবল অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রদত্ত মানবিক সহায়তা দীর্ঘমেয়াদে মূল সমাধানের তাগিদ কমিয়ে দিতে পারে। তাই জরুরি ত্রাণ সহায়তার বাইরে গিয়ে একটি ‘ট্রানজিশনাল স্ট্র্যাটেজি’ বা রূপান্তরকালীন কৌশলে যেতে হবে, যার প্রধান লক্ষ্য হবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপদ ও ফিরে যাওয়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা।
দীর্ঘমেয়াদি এই সংকটের কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ঝুঁকির কথা তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, প্রায় নয় বছর ধরে বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় সেবা দিয়ে আসছে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ক্যাম্পগুলোতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান, মানবপাচার এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
এ অবস্থা নিরসনে ক্যাম্পের চারপাশে সীমান্ত বেড়া (ফেন্সিং) ও সুনিয়ন্ত্রিত যাতায়াত ব্যবস্থার মতো নিরাপত্তা পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সফলতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ১৯৭৮ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব এবং ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দূরদর্শী উদ্যোগে বাংলাদেশ সফলভাবে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করেছিল।
অতীতের সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বর্তমান সরকার আবারও শতভাগ সফল প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গতিশীল নেতৃত্বে ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর্মুলেশন কমিটি অন রোহিঙ্গা অ্যাফেয়ার্স’ গঠিত হয়েছে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি জাতীয় কমিটি কাজ করে যাচ্ছে।
ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল কোঅপারেশন ফাউন্ডেশন (আইজিসিএফ) আয়োজিত ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: ইমার্জিং চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড রিফ্রেমিং রেসপনসিবিলিটিজ’ শীর্ষক এই গোলটেবিল আলোচনায় গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। আইজিসিএফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী আদনান রহমানের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই আলোচনায় দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মীরা অংশ নেন।

















