সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বারুহাস ইউনিয়নের বিনসাড়া গ্রামটি লোকগাথার কিংবদন্তি চরিত্র বেহুলা ও লক্ষিন্দরের স্মৃতি বিজড়িত স্থান হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, বাছোবানিয়ার কন্যা বেহুলা সুন্দরী তার মৃত স্বামী লক্ষিন্দরকে নিয়ে যে সোনার নৌকায় যাত্রা করেছিলেন, সেই নৌকাটি এই গ্রামের এক ছোট নদী বা নালায় ডুবে গিয়েছিল। আজও সেখানে মাটির নিচে নৌকা আকৃতির একটি উঁচু ঢিবি দেখা যায়, যা স্থানীয়দের কাছে ‘ডুবন্ত সোনার নৌকা’ নামে পরিচিত।
এই ডুবন্ত নৌকার পাশেই রয়েছে একটি রহস্যময় ‘জীয়নকূপ’। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, বেহুলা তার স্বামীকে জীবিত করার জন্য এই কূপ থেকেই পানি সংগ্রহ করেছিলেন। বছরের পর বছর পার হলেও এই কূপের পানি কখনও শুকায় না এবং অনেকে একে অলৌকিক গুণসম্পন্ন পবিত্র স্থান বলে মনে করেন। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই কূপের পানি পান করলে রোগমুক্তি ঘটে এবং মানত করলে মনের আশা পূরণ হয়। তবে সংরক্ষণের অভাবে বর্তমানে এই ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা অমল কুমার (৭০) জানান, ডুবন্ত নৌকা ও জীয়নকূপ ঘিরে বহু অলৌকিক গল্প প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুস সবুর (৫৫) বলেন, লোকমুখে প্রচলিত আছে যে, অতীতে এই ডুবন্ত নৌকার জায়গা থেকে মাটি কাটলে অমঙ্গল হতো, তাই জায়গাটিকে আজও বিশেষ সম্মানের চোখে দেখা হয়। কূপের পাশে বসবাসকারী জতি রানী (৭৫) জানান, রোগমুক্তির আশায় দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে মানত করতে আসেন।
ঐতিহাসিক এই স্থানটির প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে একটি প্রাচীন বটগাছ রয়েছে, যা বেহুলা ও লক্ষিন্দরের প্রেমের স্মৃতি বহন করছে বলে স্থানীয়দের দাবি। বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই গাছটিতে প্রায় ৫৬০টি ঝুরি রয়েছে এবং এর নিচেই একটি শিব মন্দির অবস্থিত। প্রতিদিন দর্শনার্থীরা এখানে ভিড় করলেও পর্যাপ্ত পর্যটন সুবিধা ও অবকাঠামোর অভাবে তারা বিড়ম্বনার শিকার হন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, যথাযথ প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও সরকারি উদ্যোগের অভাবে এই নিদর্শনগুলো হারিয়ে যাওয়ার পথে। তবে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান জানিয়েছেন, বেহুলার জীয়নকূপ ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো সংরক্ষণের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং যে খালপথের সঙ্গে বেহুলার স্মৃতি জড়িয়ে আছে, তা পুনঃখননের বিষয়েও চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।

















