‘ফার্স্ট বাংলাদেশ’ নীতিকে সামনে রেখে বিএনপি সরকার তাদের পররাষ্ট্র ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা শুরু করেছে। ক্ষমতায় আসার ছয় মাস পার হলেও বড় কিছু অর্জনের পাশাপাশি সরকারের সামনে এখনো অনেক কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। কূটনৈতিক মহলের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বর্তমানে তাদের আধিপত্য বিস্তারে বেশ সক্রিয় এবং তারা ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক ও ব্লু ইকোনমি ইস্যুতে বাংলাদেশ কোন দিকে ঝুঁকছে, তা নিয়ে উভয় দেশেরই তীক্ষ্ণ নজর রয়েছে।
সরকার গঠনের পর থেকেই বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সম্পাদিত ‘এগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড’ (এআরটি) শীর্ষক বাণিজ্য চুক্তির প্রভাব নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। এই চুক্তির ফলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পালটা শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে কমে ১৯ শতাংশে নেমে এসেছে। এতে প্রতিরক্ষা বাণিজ্য সহজতর করা, শুল্ক ফাঁকি রোধ এবং কৃষি পণ্য আমদানির মতো ১৩১টি বাংলাদেশি ও ৬টি মার্কিন শর্ত যুক্ত রয়েছে। সরকার এই চুক্তির মাধ্যমে অর্থনৈতিক ছন্দপতন এড়াতে চায়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে ২১ ও ২২ জুন মালয়েশিয়া সফর করেন। এরপর ২৩-২৬ জুন তিনি চীন সফর করেন। মালয়েশিয়া সফরে শ্রম বাজার উন্মুক্তকরণ, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও হালাল শিল্প সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে, চীন সফরে ১৩টি সমঝোতা স্মারক ও ৪টি অতিরিক্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত অর্থনৈতিক করিডর, চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন, মোংলা বন্দর আপগ্রেড এবং তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের সহযোগিতার আশ্বাস মিলেছে। এই সফরগুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত সজাগ দৃষ্টি রেখেছে।
এদিকে, জুলাই আন্দোলন ও শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় ইস্যুতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জল এখনো ঘোলা রয়ে গেছে। ভারতের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে সফরের আমন্ত্রণ জানানো হলেও, শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবস্থান ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বর্তমান সরকার অসন্তুষ্ট। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর মাধ্যমে সরকার বারবার বার্তা পাঠালেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। তবে ব্রিকস সম্মেলনের আগে সেপ্টেম্বরের ২০-২৫ তারিখের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা রয়েছে, যদিও ঢাকা এর জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির তাগিদ দিয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরের মতে, বর্তমান সরকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। তিনি মনে করেন, চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও তিস্তা প্রকল্পের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা বাস্তবায়নে বাংলাদেশের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করতে হবে। একইসাথে ভারতের সাথে সম্পর্কের স্থবিরতা কাটাতে হাই-কমিশনারের তৎপরতা ও প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়াকে সরকারের একটি কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

















