জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ডান চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন বগুড়ার বেলাল হোসেন প্রামাণিক (৩৯)। সরকারি তালিকায় ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত হয়ে তিনি মাসে ১৫ হাজার টাকা ভাতা পেলেও, এক চোখ হারানোর কারণে তাঁর ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত হয়ে ২০ হাজার টাকা পাওয়ার কথা ছিল। উন্নত চিকিৎসার সুযোগ না জানা এবং পুলিশের ভয়ে হাসপাতালে না যাওয়াসহ নানা ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন তিনি।
বগুড়ার সারিয়াকান্দি পৌরসভার কুরসাপাড়ায় নানাবাড়িতে স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে বর্তমানে বসবাস করছেন বেলাল। তিনি মূলত নদীভাঙন এলাকার বাসিন্দা; যমুনায় বসতভিটা হারিয়েছেন ১৫ বারের বেশি। পরিবার নিয়ে ঘুরেছেন এক চর থেকে আরেক চরে। তাঁর বাবার নাম পল্টু প্রামাণিক ও মায়ের নাম মোসা. মাজেদা। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে বেলাল তৃতীয়। তাঁর স্ত্রী শাহিদা আক্তার (২৮)। বড় মেয়ে মোসাম্মৎ আছিয়া (১৭) ও ছেলে মোহাম্মদ হুজাইফা (১১) মাদ্রাসায় পড়ে। ছোট ছেলে মোহাম্মদ আবু তালহার বয়স চার বছর।
বেলাল আগে ব্যাটারিচালিত ভ্যান চালিয়ে মাসে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় করতেন। ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট কাঠের মালামাল নিয়ে ভ্যান চালিয়ে বগুড়া শহরে গিয়েছিলেন তিনি। দুপুরের দিকে ফেরার পথে নিউমার্কেটের কাছে কাঁঠালতলা বাজারে একটি মিছিলের সামনে পড়েন। হঠাৎ তাঁর ডান চোখে গুলি লাগে এবং তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আন্দোলনকারীরা তাঁকে রাস্তা থেকে তুলে এক পাশে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যান। সেদিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বেলাল বলেন, ‘আমার চোখ দিয়ে তখন রক্ত ঝরছিল। প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছিল।’
সেদিন রক্তাক্ত চোখ নিয়ে হাসপাতালে না গিয়ে ভয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়াকে জীবনের বড় ভুল বলে মনে করছেন বেলাল। তিনি জানান, ‘হাসপাতালে গেলে যদি পুলিশ ধরে! আব্বাও অনেক ভয় পাইল। সেদিন আহত চোখ নিয়ে ভয়ে বাড়ি ফিরে না গিয়ে হাসপাতালে গেলে হয়তো চোখটা রক্ষা পেত।’ বাড়ি ফিরে একজন পল্লিচিকিৎসকের কাছে গেলেও ওষুধে ব্যথা কমেনি। সাত থেকে আট দিন পর চোখের অবস্থা গুরুতর হলে তিনি বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। সেখানকার চিকিৎসক তাঁকে জানান, এই চোখ আর ঠিক হবে না।
বেলাল আরও জানান, জুলাইয়ে আহত ব্যক্তিদের ঢাকায় জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল, সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না। একদিন পথে বিএনপি নেতা মোশারফ হোসেনের (বর্তমানে বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য) সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। মোশারফ হোসেন তাঁকে কিছু আর্থিক সহায়তা দিয়ে ঢাকায় গিয়ে চোখের চিকিৎসক দেখাতে বলেন। এরপর বেলাল আরও কিছু টাকা ধার করে ঢাকায় এসে চিকিৎসক দেখিয়ে বগুড়ায় ফিরে যান। পরে বগুড়ার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) তাঁর চোখে অস্ত্রোপচার হলেও খুব বেশি উন্নতি হয়নি।
সহায়তা প্রসঙ্গে বেলাল বলেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে দুই লাখ টাকা এবং জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে এক লাখ টাকা পেয়েছেন। তবে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে তিনি কোনো সহায়তা পাননি। ২০২৪ সালের শেষের দিকে ও ২০২৫ সালে তিনবার ঢাকায় এসে তিনি জুলাই ফাউন্ডেশনে যোগাযোগ করলেও কোনো অর্থসহায়তা পাননি। তাঁকে শুধু পরে সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের ‘জুলাই শহীদ’ ও আহত ব্যক্তিদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, এই অভ্যুত্থানে ৮৬৫ জন শহীদ হয়েছেন এবং ১৫ হাজার ৯০৩ জন আহত যোদ্ধা তালিকাভুক্ত হয়েছেন। সরকার অতি গুরুতর আহত ব্যক্তিদের ‘ক’ শ্রেণি, গুরুতর আহত ব্যক্তিদের ‘খ’ শ্রেণি এবং সাধারণ আহত ব্যক্তিদের ‘গ’ শ্রেণিতে তালিকাভুক্ত করে গেজেট প্রকাশ করেছে। ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত ব্যক্তিরা মাসে ১৫ হাজার টাকা ভাতা পান, যাদের আহত হওয়ার ধরনের বিবরণে বলা হয়েছে ‘আংশিক দৃষ্টিহীন, মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত বা অনুরূপ আহত ব্যক্তি’৷
অন্যদিকে, ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত আহত হওয়ার ধরনের মধ্যে রয়েছে ‘ন্যূনতম এক চোখ বা হাত বা পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের অনুপযোগী। সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন, সম্পূর্ণরূপে মানসিক বিকারগ্রস্ত, অঙ্গহানি, গুরুতর আহত হয়ে দৈনন্দিন জীবিকা নির্বাহের জন্য কাজ করতে অক্ষম’। এই তালিকায় থাকা আহত ব্যক্তিরা মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা পান। সেই হিসাবে, এক চোখের দৃষ্টি হারানো বেলালের নাম ‘ক’ শ্রেণিতে থাকার কথা এবং তাঁর মাসে ২০ হাজার টাকা করে সহায়তা পাওয়ার কথা। কিন্তু তিনি ‘খ’ শ্রেণিতে থাকায় মাসে ১৫ হাজার টাকা পাচ্ছেন, যা তাঁর প্রাপ্য থেকে কম। বেলাল নিজেও এই বিষয় সম্পর্কে অবগত ছিলেন না।
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) কামাল আকবর প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, তহবিলে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় জুলাই শহীদ ও আহত প্রত্যেককে সম্পূর্ণ সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, গত পাঁচ মাস ধরে ফাউন্ডেশনের কর্মীদের বেতনও দেওয়া যাচ্ছে না। ফাউন্ডেশনের মোট ৩৮৩ কোটি টাকা প্রয়োজন ছিল, যার মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ১০০ কোটি টাকা দিয়েছিল। এ পর্যন্ত মোট ৬ হাজার ৩০০ জনকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পুনর্বাসনের লক্ষ্যে আরও ২৬৩ কোটি টাকা প্রয়োজন উল্লেখ করে কামাল আকবর বলেন, বর্তমান সরকার শিগগিরই টাকা দেবে বলে জানিয়েছে।
বেলাল হোসেন জানান, শুধু সরকারি ভাতার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তাঁর সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে। নিয়মিত ওষুধও খেতে হয় তাঁকে। এক চোখে দেখতে না পাওয়ায় শুরুতে মনে অনেক কষ্ট পেলেও এখন নিজেকে সামলে নিয়েছেন বেলাল। তিনি বলেন, ‘প্রথমে মনে অনেক কষ্ট পাইছিলাম। এখন ভাবি, বাঁইচা আছি এইটাই বিরাট ব্যাপার। একটা চোখ নষ্ট। আরেকটা চোখ তো আছে।’

















