প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৯: ১৮আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৯: ২০। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় সক্রিয় তিনটি আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন প্রতি বছর ৬১০ কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, এই অঞ্চলের ৪১টি ভিন্ন খাত থেকে বাধ্যতামূলকভাবে এই বিশাল অংকের অর্থ আদায় করা হয়। সংগৃহীত এই অর্থ দিয়ে সংগঠনগুলো অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদের বিশাল মজুত গড়ে তুলেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-সন্তু) ২৮০ কোটি টাকা, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-প্রসীত) ২৫০ কোটি টাকা এবং কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) ৭৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা চাঁদা হিসেবে সংগ্রহ করে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, পাহাড়ে উৎপাদিত কলা, আদা, হলুদ, আনারস ও আমসহ জুমের ফসল বিক্রির প্রতিটি ধাপে সশস্ত্র গোষ্ঠীদের চাঁদা দিতে হয়। এমনকি বাড়ি নির্মাণ, গবাদিপশু বেচাকেনা, নতুন ব্যবসা শুরু করা, কিংবা সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন থেকেও এই ‘জবরদস্তি ট্যাক্স’ আদায় করা হয়। এই চাঁদাবাজির খাতগুলোকে ছয়টি প্রধান সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে দোকানপাট, মোবাইল টাওয়ার, ইটভাটা, পরিবহন এবং কৃষি ও বনজ পণ্য। বিশেষ করে ট্রাক, সিএনজি, লঞ্চ ও স্পিডবোটসহ আটটি পরিবহন খাত থেকে নিয়মিত চাঁদা নেওয়া হয়।
নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত এক বছরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ১০৩ জনকে অপহরণ করেছে। মুক্তিপণ আদায়, রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি সঞ্চারের জন্য অপহরণকে তারা একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে। সংগৃহীত অর্থ দিয়ে তারা ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্র, গোলাবারুদ ও মাদকদ্রব্য সংগ্রহ করে। জেএসএস সন্তুর কাছে ১৯টি অস্ত্র ও ২,৫৮০ রাউন্ড গোলাবারুদ, আর ইউপিডিএফ প্রসীতের কাছে ৬০টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৮৮৫০ রাউন্ড অ্যামুনিশন ও হ্যান্ড গ্রেনেডসহ রকেট লঞ্চারের মতো মারাত্মক সমরাস্ত্র রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এমনকি ড্রোন ও সিগন্যাল জ্যামারের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিও তাদের দখলে রয়েছে।
রাঙামাটি জেলা পুলিশ সুপার আব্দুর রকিব জানান, চাঁদাবাজির অভিযোগ পেলেই মামলা রেকর্ড করা হয় এবং দুর্গম এলাকায় সেনাবাহিনী ও বিজিবির সহযোগিতায় অভিযান চালানো হয়। এদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) রোকন উদ্দিন বলেন, ২০২১ সালে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো কার্যত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ১৯৯৭ সালের অসম শান্তি চুক্তির পর আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলো লোক দেখানো অস্ত্র জমা দিলেও তাদের কাছে বিশাল মজুত রয়ে গেছে। তিনি মনে করেন, শান্তিচুক্তির পুনর্মূল্যায়ন এবং সব অংশীজনকে নিয়ে একটি কমিশন গঠন করে ভূমি সমস্যা সমাধান ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম দমনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

















