রাজধানীর বাজারে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম আরও এক দফা বেড়েছে। বড় বাজার থেকে এক হালি বাদামি ডিম ৫০ টাকায় কেনা গেলেও পাড়া-মহল্লার মুদিদোকানে তা ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য একটি ডিমের দাম পড়ছে প্রায় ১৫ টাকা, যা তাদের আমিষের অন্যতম প্রধান উৎস।
খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, বর্তমানে এক ডজন (১২টি) ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকা দরে। গত এক সপ্তাহে ডিমের দাম ডজনে প্রায় ১০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফার্মের মুরগির সাদা ডিমের ডজন ১৪৫-১৫৫ টাকা এবং হাঁসের ডিমের ডজন ১৯০-২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত দুই মাস ধরে ব্রয়লার মুরগির কেজি ২০০ টাকার আশপাশে এবং ডিমের ডজন দেড় শ টাকার ওপরে ছিল, যা এখন আরও বাড়ল।
ডিমের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে নিম্ন আয়ের মানুষ চরম হিমশিম খাচ্ছেন। মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের বাসিন্দা শাহানা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘কয়েক দিন আগে তরল দুধের দাম বেড়েছিল; এর আগে বেড়েছে সয়াবিন তেল, আটা ও চিনির দাম। এখন ডিমের দামও বাড়ল। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে মানুষ খাবেটা কী?’
বিক্রেতারা মূল্যবৃদ্ধির জন্য বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে মুরগির খাবার ও ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং লোডশেডিংয়ের কারণে ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালানোর খরচ বৃদ্ধি। কেউ কেউ বলছেন, মৌসুমের এ সময়টায় আর্দ্রতা ও গরম বেশি থাকায় মুরগি ডিম কিছুটা কম পাড়ে।
ডিম উৎপাদনকারী শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান ডায়মন্ড এগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কায়সার আহমেদ প্রথম আলোকে জানান, গত দুই মাসে মুরগির খাদ্যের দাম কেজিতে ১২ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। প্রতি ৮টি ডিম উৎপাদনে এক কেজি খাবার লাগে, সেই হিসাবে দুই হালি ডিমে খরচ বেড়েছে ১২ টাকা। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে ফিডের কাঁচামালের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসছে, যা দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির কারণে হতে পারে এবং এতে দাম বেশি পড়ছে।
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর দেশে অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে ডিমের দাম বাড়তে শুরু করে, কারণ তখন খাদ্যের দাম বেড়ে যায়। এর আগে বছরজুড়ে ডিমের ডজন ৮৫ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে থাকত। এখন বছরজুড়ে ডিমের দাম ডজন ১২৫ থেকে ১৬০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে। কখনো কখনো দর আরও বেড়ে যায়; যেমন ২০২৪ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝিতে ডিমের ডজনপ্রতি দর ২০০ টাকায় উঠেছিল। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব অনুযায়ী, গতকাল ডিমের হালি ছিল ৫০-৫৫ টাকা, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ বেশি।
ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণে গত ২৭ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পোলট্রি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠক শেষে জানানো হয়, ডিমের উৎপাদন খরচ এবং উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত সরবরাহের বিভিন্ন ধাপে কতটা মূল্য সংযোজন ও মুনাফা হচ্ছে, তা পর্যালোচনা করবে সরকার। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির সাংবাদিকদের বলেন, ডিমের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর সরাসরি চাপ পড়ে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় ২ হাজার ৪৪১ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়। বছরে দেশের মানুষের জনপ্রতি ডিমের প্রাপ্যতা ১৩৭টির কিছু বেশি, তবে এ হিসাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপে জানানো হয়, দেশের মানুষের জনপ্রতি দৈনিক ডিম গ্রহণের পরিমাণ ১২ দশমিক ৭ গ্রাম, যা ২০১৬ সালের ১৩ দশমিক ৬ গ্রামের তুলনায় কম।
আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে ডিমের দাম প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বেশি। পাকিস্তানের পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সেখানে এখন ডিমের দর বাংলাদেশি মুদ্রায় ডজন ১১৫ টাকা। শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ডিমের ডজন ১৩৮ টাকা। ভারতের কলকাতা থেকে প্রথম আলোর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সেখানে ডিমের ডজন ১১৫ টাকা। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) ২০২৪ সালের একটি সমীক্ষা বলছে, এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চা, মুরগির খাবার ও ডিমের দাম ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশে বেশি। এর কারণ হিসেবে আমদানি একেবারেই নিয়ন্ত্রিত রেখে ‘অতিমাত্রায়’ সুরক্ষা প্রদানকে দায়ী করা হয়েছে।
এখন তা আরও বাড়ল।খুচরা বিক্রেতারা জানান, বর্তমানে এক ডজন (১২টি) ডিম ১৫৫-১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

















