আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) একজন সাবেক বিচারক নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আদালতটির ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। এই পদক্ষেপে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইউরোপীয় মিত্রদের কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত আইসিসি মূলত যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার করে থাকে। ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই এই আদালতের বিরোধিতা করে আসছে এবং অতীতেও আইসিসির বিচারক ও প্রসিকিউটরদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। তবে এবারের নিষেধাজ্ঞা আগের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত, যা আইসিসিকে সেবা প্রদানকারী বিভিন্ন কোম্পানিকেও শাস্তির মুখে ফেলতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে মার্কিন নাগরিকদের বিচার করতে দেবেন না। তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আইসিসি তার হুমকি বন্ধ না করলে যুক্তরাষ্ট্র এর অস্তিত্ব শেষ করে দেবে। রুবিও জানান, এই দুর্বৃত্ত আদালতের সঙ্গে লেনদেন নিষিদ্ধ করা হবে, তাদের সম্পদের পথ বন্ধ করা হবে এবং কার্যক্রম চালানোর সক্ষমতা পঙ্গু করে দেওয়া হবে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা এমনভাবে সাজিয়েছে যাতে সদস্যদেশগুলো আলোচনার সুযোগ পায় এবং আদালতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় চারটি সাধারণ লাইসেন্স দিয়েছে, যার মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ, সফটওয়্যার, পেনশনের অর্থ পরিশোধ এবং আদালতের হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু লেনদেন করা যাবে।
আইসিসির ডেপুটি প্রসিকিউটর নাজহাত শামীম খান এই নিষেধাজ্ঞার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এর মূল উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক পরিসরে আইনের শাসন এবং একটি স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে দুর্বল করা। তিনি রয়টার্সকে জানান, এই নিষেধাজ্ঞার কারণে আদালতের কার্যক্রম বন্ধ হবে না এবং তাদের সব মামলা, তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। আইসিসির কর্মকর্তারা কয়েক মাস ধরেই এমন পরিস্থিতির আশঙ্কা করছিলেন এবং এর মোকাবিলায় মাইক্রোসফটের পরিবর্তে ওপেন সোর্স সফটওয়্যার ব্যবহারের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। এছাড়া আইসিসির রেজিস্ট্রার ওসভালদো জাভালা গিল ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ‘ব্লকিং মেকানিজম’ ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার প্রভাব থেকে ইউরোপের দেশগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া যায়।
উল্লেখ্য, দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজীবী নাভি পিল্লাই আজ নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন, যিনি ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আইসিসির আপিল বিভাগের বিচারক ছিলেন। নোবেল কমিটি জানিয়েছে, পিল্লাইকে এই পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যমে তারা বিশ্বকে মনে করিয়ে দিতে চায় যে, বিচারক ও আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে রয়েছে। আইসিসির সদস্য সংখ্যা বর্তমানে ১২৫টি। ন্যাটোর সদস্যদের মধ্যে কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক আইসিসির সদস্য নয়। অতীতে আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের কর্মকাণ্ড তদন্তের উদ্যোগ নিলে যুক্তরাষ্ট্র এর তীব্র বিরোধিতা করেছিল এবং পরে সেই তদন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়। এছাড়া ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি নিয়েও ওয়াশিংটন কঠোর সমালোচনা করে আসছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই ওয়াশিংটন নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে।.আন্তর্জাতিক পরিসরে আইনের শাসন এবং একটি স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠানের কাজ দুর্বল করাই এই নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য।…আমাদের সব মামলা, তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম চলতে থাকবে।নাজহাত শামীম খান, ডেপুটি প্রসিকিউটর, আইসিসি.আদালতের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে, এমন আশঙ্কায় আইসিসির কর্মকর্তারা কয়েক মাস ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

















