ভরা মৌসুমেও দেশের বাজারে ইলিশের দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। গত দুই বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন বা আহরণ কমে যাওয়ায় বাজারে এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গবেষক ও মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের তৈরি বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা এবং প্রাকৃতিক পরিবর্তনের কারণে দেশের এই জনপ্রিয় মাছের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে অতিসূক্ষ্ম জালের ব্যবহার, অতিরিক্ত আহরণ, নদী ও সমুদ্রের দূষণ এবং ডুবোচরের কারণে ইলিশের বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটে গিয়ে দেখা যায় ক্রেতা ও বিক্রেতাদের দরকষাকষির চিত্র। বেসরকারি চাকরিজীবী আলতাফ হোসেন এক কেজি ওজনের একটি ইলিশ কিনতে এসে দাম শুনে থমকে যান। বিক্রেতারা এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম চাচ্ছেন ২ হাজার ৪০০ টাকা, যা গত বছর তিনি ১ হাজার ৮০০ টাকায় কিনেছিলেন। বাজেটে না মেলায় শেষ পর্যন্ত তিনি ৭৫০ গ্রাম ওজনের দুটি মাছ কেনেন। ওই বাজারের ২০ বছরের অভিজ্ঞ মাছ বিক্রেতা শুক্কুর আলী জানান, এবার সব ধরনের ইলিশের দাম গত বছরের চেয়ে কেজিপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি। তিনি এবার এক কেজির ইলিশ ২ হাজার ২০০ টাকার নিচে বিক্রি করতে পারেননি। দাম বেশি হওয়ার কারণে বাজারে এখন ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রাম ওজনের ছোট ইলিশের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। আরেক বিক্রেতা সরাফত আলীও একই কথা জানান। তিনি বলেন, দাম শুনে ক্রেতারা চলে যাচ্ছেন, ফলে ছোট আকারের ইলিশ বিক্রি করেই ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে হচ্ছে।
গত এক দশকের সরকারি ও ভোক্তা অধিকার সংগঠনের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইলিশের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, তবে ২০২২ সালের পর এই বৃদ্ধির গতি তীব্র হয়েছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ৫০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ওজনের ইলিশের গড় দাম ছিল ৫০৫ টাকা। ২০১৬ সালে ১ কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হতো ৯৫০ থেকে ১ হাজার টাকায়, যা ২০২৩ সালে দাঁড়ায় ১ হাজার ২০০ টাকায়। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৮ সালে সব আকারের ইলিশের বার্ষিক গড় খুচরা মূল্য ছিল ৭০৫ টাকা ৫০ পয়সা। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫০ টাকায় এবং ২০২৩ সালে হয় ১ হাজার ৯৫ টাকা ৯০ পয়সা। ২০২৪ সালে এই গড় দাম আরও বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ১৬৮ টাকা ৫৬ পয়সায় পৌঁছায়। অর্থাৎ, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইলিশের বার্ষিক গড় দাম প্রায় ৬৭ শতাংশ বেড়েছে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এক থেকে দেড় কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছিল ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। আর ২০২৫ সালের আগস্টে এসে একই ওজনের ইলিশের দাম এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকায়। এছাড়া ৭৫০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ওজনের মাছের দাম ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ৫০০ থেকে ৭৫০ গ্রামের মাছের দাম ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় ঠেকেছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৯৫ হাজার টন। এরপর প্রতিবছর উৎপাদন বাড়লেও ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ টন উৎপাদনের পর টানা দুই বছর তা হ্রাস পেয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন ৭ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টনে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও ১২ শতাংশ কমে প্রায় ৫ লাখ টনে নেমে আসে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, চলতি মৌসুমে ইলিশের আহরণ গত বছরের চেয়ে আরও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম হতে পারে।
ইলিশের প্রধান আড়ত চাঁদপুর ও পটুয়াখালীর মহিপুরেও একই চিত্র। চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি আবদুল বারী জমাদার জানান, তিন বছর আগেও জুলাই মাসের পর থেকে এই আড়তে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার মণ ইলিশ আসত। কিন্তু এবার দৈনিক গড়ে আড়াই শ মণের বেশি ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না, যেখানে গত বছরও গড়ে ৪০০ মণের মতো ইলিশ আসত। ৩০ বছরের অভিজ্ঞ এই ব্যবসায়ী ইলিশ কমে যাওয়ার পেছনে দূষণ, ডুবোচর এবং সাগরে নিষিদ্ধ ‘বেহুন্দি’ জালের অবাধ ব্যবহারকে দায়ী করেন। অন্যদিকে, পটুয়াখালীর কলাপাড়ার মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবসায়ী ফজলু গাজী জানান, সাগরে বারবার আবহাওয়ার সতর্কসংকেত থাকার কারণে ট্রলারগুলো পর্যাপ্ত মাছ নিয়ে ফিরতে পারছে না। গত বছর যেখানে বেশির ভাগ ট্রলার ২০ থেকে ৪০ মণ মাছ নিয়ে ফিরত, এবার খুব কম ট্রলারই ২০ থেকে ৩০ মণের বেশি মাছ আনতে পেরেছে। তাঁর মতে, নদীতে মাছ না থাকার কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।
ইলিশের এই দ্রুত উৎপাদন হ্রাস গবেষকদের ভাবিয়ে তুলেছে। প্রখ্যাত ইলিশ-গবেষক মো. আনিছুর রহমান এই পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক আখ্যা দিয়ে বলেন, মানুষ এবং প্রকৃতি উভয়ের কারণেই ইলিশের উৎপাদন কমছে। তিনি বেহুন্দি জালের অতি ব্যবহার, অতি আহরণ, ডুবোচর ও দূষণকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে এ বিষয়ে জরুরি গবেষণার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, দেশের সমুদ্র হচ্ছে ইলিশের প্রধান ভান্ডার, যা এখন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা তায়েফা আহমেদ জানান, তাঁদের একটি দল সম্প্রতি হাতিয়ার মোহনার মুখে বিশাল এলাকাজুড়ে নিষিদ্ধ বেহুন্দি জালের বিস্তার দেখতে পেয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, নদীর মুখে যদি এভাবে জালের বিস্তার থাকে, তবে ইলিশ কীভাবে বিচরণ করবে? ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, এবার ধরা পড়া ইলিশের মধ্যে মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশের পেটে ডিম পাওয়া গেছে, যা দুই-তিন বছর আগেও প্রায় ৫০ শতাংশ ছিল। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে বাজারে বড় আকারের ইলিশের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে।

















