ফ্রান্সের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ আবারও উত্তাল হয়ে উঠেছে। স্কুলের সামনে অবরোধ, রাজপথে লাখো মানুষের বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার এবং শিক্ষার্থীদের আহত হওয়ার ঘটনায় দেশটির পরিস্থিতি ক্রমেই অস্থিরতার দিকে যাচ্ছে। একটি শিক্ষা-সংক্রান্ত অসন্তোষ কীভাবে জাতীয় সংকটে মোড় নিতে পারে, ফ্রান্সের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ তারই একটি প্রকট উদাহরণ।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। তার দাবি, ফ্রান্সের এই অস্থিরতার পেছনে রয়েছে নিয়ন্ত্রণহীন অভিবাসন এবং ইসলাম ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে। তবে তার এই ব্যাখ্যা কি ফ্রান্সের মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? ফরাসি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং আন্দোলনকারীদের বক্তব্য বলছে, বর্তমান আন্দোলনের মূল কারণ ধর্ম বা অভিবাসন নয়, বরং শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট।
শিক্ষার্থীরা মূলত শিক্ষক-সংকট, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, স্কুল ভবনের জরাজীর্ণ দশা, সহায়ক কর্মীর অভাব এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে। ৬ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ২ লাখ ৬৬ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেয়, যেখানে প্যারিসেও বড় সমাবেশ হয়। সেদিন কয়েকশ মানুষকে আটক এবং বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। অনেক শিক্ষার্থী মনে করছে, রাষ্ট্র তাদের কাছ থেকে সাফল্য আশা করলেও সেই সাফল্যের সুযোগ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
ফ্রান্সের শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য ও দরিদ্র এলাকার স্কুলগুলোর পিছিয়ে থাকা নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে। বিশেষ করে প্যারিসের উপকণ্ঠে অভিবাসী-অধ্যুষিত শহরতলিগুলোতে এই সমস্যা আরও গভীর। যদিও অভিবাসন ও জাতীয় পরিচয় নিয়ে ফ্রান্সে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন নয়, কিন্তু কোনো দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সমস্যাকে একটি নির্দিষ্ট আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে প্রমাণ করার মতো যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
আন্দোলনটি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ নয়; বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। সরকার একে আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখছে এবং বামপন্থী দল ‘লা ফ্রঁস ইনসুমিজ’-এর সমর্থন নিয়ে সমালোচনা করছে। অন্যদিকে, ৫ অক্টোবর লঁস শহরে পুলিশের বিস্ফোরক শব্দ-সৃষ্টিকারী অস্ত্রের আঘাতে ১৫ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়ে হাত হারালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। এই ঘটনার পর সরকার উচ্চবিদ্যালয়ের বিক্ষোভে ওই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার স্থগিত করে এবং তদন্ত শুরু করে।
ট্রাম্পের মন্তব্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখানেই যে, তিনি বর্তমান আন্দোলনকে অভিবাসন ও ইসলামের সঙ্গে যুক্ত করলেও, শিক্ষার্থীদের মূল দাবির সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া কঠিন। আজকের ফরাসি তরুণদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উন্নত শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা। রাষ্ট্র ও প্রজন্মের মধ্যে আস্থার সংকটই সম্ভবত ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতির মূল কারণ। রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং বিভিন্ন স্তরের সামাজিক সমস্যা মিলিয়ে ফ্রান্সের সংকটটি বহুস্তরীয়, যাকে কেবল একপাক্ষিক ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়।

















