দেশে গ্যাসের গড় উৎপাদন দৈনিক ১৫ কোটি ঘনফুটের বেশি কমে যাওয়ায় এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি সীমাবদ্ধতার কারণে শিল্প খাতে নতুন গ্যাস-সংযোগ দেওয়া আপাতত বন্ধ রাখছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশনকে (পেট্রোবাংলা) এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠিয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন হ্রাস এবং দুটি ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) ভিত্তিক এলএনজি আমদানির সীমাবদ্ধতার কারণে শিল্পে নতুন গ্যাস-সংযোগের বিষয়টি বর্তমানে বিবেচনা করা হচ্ছে না। কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত এই দুটি এফএসআরইউ টার্মিনালের সম্মিলিত গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুট, তবে বর্তমানে একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় সরবরাহ ৫০ কোটি ঘনফুটেরও কমে নেমে এসেছে। এর ফলে গত এক সপ্তাহ ধরে দেশের সকল খাতে গ্যাসের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, শিল্পে গ্যাস-সংযোগ বন্ধের এই সিদ্ধান্ত সাময়িক। সরকার দ্রুত গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে ভোলার গ্যাস ঢাকায় আনার প্রক্রিয়া এবং মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি আমদানির মতো একাধিক বিকল্প নিয়ে কাজ করছে। সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ার পর একটি অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করে সংযোগ দেওয়া হবে। যারা অনুমোদনের পর ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়েছেন, তারা অবশ্যই আগে বিবেচনায় থাকবেন। সর্বোচ্চ সরবরাহ করা হয় ১০৫ কোটি ঘনফুট।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলেও উৎপাদনে যেতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে, আমদানি বাড়াতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে অন্তত দেড় বছর সময় প্রয়োজন।
জ্বালানি বিভাগের দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্যাসের অভাবে দেশের অর্ধেকের বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে থাকে এবং সার কারখানা বছরের অধিকাংশ সময় উৎপাদন বন্ধ রাখে। নতুন করে সংযোগ দিলে অন্যwhere গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিতে হবে, যা কোনো সমাধান নয়। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে একাধিক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চললেও সরবরাহ বাড়তে অন্তত এক বছর লাগতে পারে, এরপর সরকার শিল্পে সংযোগ দেওয়ার কথা ভাববে।
মালয়েশিয়া থেকে এলএনজি আমদানির বিষয়ে গতকাল দেশটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আইএসও ট্যাংকের জন্য অবকাঠামো নির্মাণে এক বছর সময় লাগবে এবং এটি দিনে মাত্র ১ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে, যা একটি বড় শিল্পকারখানার চাহিদাও মেটাবে না। এটি খুবই ছোট পরিসরের সরবরাহ পদ্ধতি এবং এতে এলএনজির খরচও বেশি পড়বে, তাই এটি কার্যকর করা কঠিন হবে। টার্মিনাল নির্মাণ করেই আমদানি বাড়াতে হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেছেন, বিদ্যমান দুটি টার্মিনালের পাশাপাশি আরও দুটি ভাসমান এবং একটি স্থলভাগে টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সামিটের চুক্তি বাতিল করে এবং এক্সিলারেটের সঙ্গে চুক্তি না করার সিদ্ধান্ত নেয়, যার ফলে গত দেড় বছরে নতুন কোনো টার্মিনাল যুক্ত হয়নি। শুধু টার্মিনাল নির্মাণ করলেই আমদানি থেকে সরবরাহ বাড়ানো যাবে না। মহেশখালী থেকে এলএনজি আনার জন্য দুটি সমান্তরাল পাইপলাইন থাকলেও আনোয়ারা স্টেশন থেকে পরবর্তী পাইপলাইনগুলোর ব্যাস কম হওয়ায় সরবরাহ সীমিত। সরবরাহ বাড়াতে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ জরুরি। ২০১৮ সাল থেকে শুরু হয় এলএনজি আমদানি।
পেট্রোবাংলা সূত্র অনুযায়ী, দেশে ১১ শতাংশ গ্যাস গৃহস্থালি রান্নার কাজে, ৪১ শতাংশ বিদ্যুৎ খাতে, ৩৬ শতাংশ শিল্পে, ৬ শতাংশ সারে, ৫ শতাংশ সিএনজি খাতে এবং ১ শতাংশ চা বাগানে ব্যবহৃত হয়। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ খাত থেকে সার বা অন্য খাতে সরবরাহ সমন্বয় করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই দেশের গ্যাস খাত চলছে। প্রতিশ্রুত সংযোগগুলো দেওয়া হলে আরও প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হবে, যা বর্তমানে সংস্থানের কোনো উপায় নেই। এ দুটি পাইপলাইন দিয়ে ১৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যাবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে অনুসন্ধানের তুলনায় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের সফলতার হার বেশি হলেও যথাযথ অনুসন্ধান হয়নি। সমুদ্রসীমা বিজয়ের ১৪ বছর পরও বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস আবিষ্কার করা যায়নি। স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানও জোরদার ছিল না। দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান ও উৎপাদনে জোর দিলেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান মিলতে পারে। আমদানিনির্ভরতায় ঝুঁকি থেকেই যায়। জ্বালানির অভাবে অর্থনীতি এগোচ্ছে না, আর অর্থনীতি এগোচ্ছে না বলে জ্বালানি আমদানির জন্য ডলারও জমা হচ্ছে না; দেশ একটি দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়ে গেছে।
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, দীর্ঘদিনের জমে থাকা সংকট রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। সরকার একাধিক উপায়ে এটি সমাধানের চেষ্টা করছে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে ১০০টি কূপ খনন, সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র আহ্বান এবং স্থলভাগে অনুসন্ধান কার্যক্রম চলমান আছে। নতুন করে একটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের দরপত্র আহ্বানের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জ্বালানি আমদানির উৎস ও সরবরাহ অবকাঠামো বহুমুখী করার কাজও চলছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম আরও বলেন, সরবরাহ বাড়িয়ে নতুন সংযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক। তবে যারা অনুমোদনের পর ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়ে এবং ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছেন, তাদের সংযোগ না দিলে তারা দেউলিয়া হয়ে যাবে। দ্রুততম সময়ে সরবরাহ বাড়িয়ে হলেও তাদের সংযোগ দেওয়া উচিত। স্বল্পমেয়াদে সরবরাহ বাড়াতে আমদানির কোনো বিকল্প নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এলএনজি টার্মিনালের চুক্তি বাতিল করা ঠিক হয়নি। এখন দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানি বাড়ানোর অবকাঠামোও তৈরি করতে হবে। আপাতত কোনো সহজ মুক্তি নেই।
গ্যাস–সংকটের কারণে ২০০৯ সালের ২১ জুলাই থেকে শিল্প ও বাণিজ্যিক এবং ২০১০ সালের ১৩ জুলাই থেকে আবাসিক গ্রাহকদের নতুন সংযোগ দেওয়া বন্ধ করা হয়।
২০১৭ সালে দিনে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা হয়েছে।

















