একটি স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা কেবল প্রশাসনিক বা সামরিক শক্তির ওপর ভর করে টিকে থাকে না; এর পেছনে প্রয়োজন হয় একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক কাঠামো, যা নিপীড়ন ও অন্যায়কে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য বা স্বাভাবিক করে তোলে। দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের মতে, শাসকের নিষ্ঠুরতার চেয়েও বুদ্ধিজীবীদের নীরবতা ও চাটুকারিতা পৃথিবীর বেশি ক্ষতি করে। শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে এই সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের নগ্ন রূপ দেখা গেছে, যেখানে রাষ্ট্র জোরপূর্বক নির্দিষ্ট চিন্তাধারা ও মূল্যবোধ চাপিয়ে দিয়ে ভিন্নমত ও মুক্তচিন্তাকে দমন করেছে।
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রতিটি বিতর্কিত নির্বাচনের সময় ক্ষমতার ছায়ায় একদল ‘কালচারাল ফ্যাসিস্ট’ সক্রিয় ছিল। বিএনপি-জামায়াত কর্মীদের গুম-খুন ও দমন-পীড়নের সময় তারা উটপাখির মতো ভূমিকা পালন করেছে, এমনকি জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন তারা সরাসরি হত্যাযজ্ঞের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। আজ সেই একই গোষ্ঠী নতুন ভাষা ও কৌশলে ইতিহাস বিকৃত করে অতীতের দায় এড়াতে চাইছে। সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ থেকে শুরু করে দলদাস শিল্পী, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক—সবাই তাদের পদ-পদবি ও সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে শাসকের অপশাসনকে বৈধতা দিয়েছেন।
সাংস্কৃতিক আমলাতন্ত্রের সদস্যরাও সরকারি বেতনভুক্ত হয়ে বিবেক বন্ধক রেখে ফ্যাসিবাদের প্রোপাগান্ডা চালিয়েছেন। এছাড়া অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সার ও প্রোপাগান্ডিস্টরা সাইবার বুলিং ও চরিত্রহননের মাধ্যমে শাসকের বিরোধিতাকারীদের দমন করেছেন। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর এই কালচারাল ফ্যাসিস্টদের একটি অংশ সাময়িকভাবে ঘাপটি মেরে থাকলেও, পরিস্থিতি বুঝে তারা এখন নতুন করে সক্রিয় হয়েছে। তাদের কেউ কেউ নিজেদের পরিস্থিতির শিকার দাবি করছেন, আবার কেউ কেউ বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছাকাছি ভিড়ে পদ-পদবি বাগিয়ে নিচ্ছেন।
বর্তমানে এই গোষ্ঠীটি বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে যে, আগের শাসনই ভালো ছিল। জুলাই বিপ্লবের পক্ষের শক্তির মধ্যে বিভেদ দেখে তারা উৎসাহিত হচ্ছে এবং জুলাইয়ের চেতনাকে হেয় করে ফ্যাসিবাদের অবশিষ্টাংশকে সংগঠিত করার জ্বালানি জোগাচ্ছে। সোমা ইসলামের মতো ব্যক্তিদের লাইভ শোতে জুলাই বিপ্লবকে প্রশ্নবিদ্ধ করা বা ড. ইউনূসের ১৮ মাসকে ১৫ বছরের লুটপাটের চেয়ে খারাপ বলে প্রচার করা মূলত পতিত ফ্যাসিবাদকে পুনর্বাসনেরই একটি কৌশল।
ফ্যাসিবাদ একবার বিদায় নিলেও এর সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিজীবী ভিত্তি উপড়ে ফেলা না গেলে তা ছদ্মবেশে ফিরে আসে। জুলাই বিপ্লবের রক্তস্নাত অর্জন টিকিয়ে রাখতে হলে কেবল রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধেই নয়, বরং যারা ফ্যাসিবাদের পক্ষে বয়ান তৈরি করে তা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নতুন বাংলাদেশের নাগরিকদের এই বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া জরুরি, তবেই শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানানো সম্ভব হবে।

















