প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫: ৩৮। ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন পরিচালনায় এবার ব্যয়ের বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে। ২০২১ সালের ইউপি নির্বাচনে পরিচালনা খাতে ব্যয় হয়েছিল ৪৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। তবে আসন্ন নির্বাচনের জন্য একই খাতে সম্ভাব্য ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ১৫১ কোটি ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রস্তাবিত এই তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের ব্যবধানে এই খাতে খরচ প্রায় ২৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্র ও নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ইউপি নির্বাচন উপলক্ষে ১২টি কোডভিত্তিক পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৪৪ কোটি ১০ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এর মধ্যে অন্যান্য মনিহারি খাতে ৭১ কোটি ৯৯ লাখ, সম্মাননা ভাতা ৪৪৬ কোটি ৯৪ লাখ, যাতায়াত ভাতা ৯৬ কোটি, আপ্যায়ন ব্যয় ৯৬ কোটি ৭৪ লাখ, প্রচার ও বিজ্ঞাপন সাত কোটি, মুদ্রণ ও বাঁধাই ৫০ কোটি, যানবাহন ব্যবহার দুই কোটি, দায়িত্ব পালনকালে হতাহতদের ক্ষতিপূরণ চার কোটি, অনিয়মিত শ্রমিকের মজুরি ১৭ কোটি ১৬ লাখ, জ্বালানি ৪৬ কোটি ৬০ লাখ, দৈনিক ভাতা এক কোটি ৮২ লাখ এবং পরিবহন ব্যয় তিন কোটি ৯৯ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যয়সহ সব মিলিয়ে আসন্ন নির্বাচনে মোট ব্যয় প্রায় তিন হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এই বিশাল অর্থসংস্থান নিশ্চিত করতে শিগগির ইসি ও সংশ্লিষ্ট তিন বিভাগের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের ৩,৯৮১টি ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন সম্পন্ন করতে অক্টোবরের মধ্যেই তফসিল ঘোষণার বাধ্যবাধকতা রয়েছে কমিশনের ওপর। ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, নভেম্বরের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে নির্বাচন তফসিল ঘোষণার আগে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। সংলাপে না বসলে চলতি মাসেই তফসিল ঘোষণা হতে পারে।
বর্তমানে দেশে মোট ৪,৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ থাকলেও চলতি বছর ৩,৯৮১টিতে ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণে পাবলিক পরীক্ষা ও ধর্মীয় উৎসবের বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত স্কুলগুলোতে বার্ষিক পরীক্ষা থাকায় ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষক কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন সমন্বয় করা কমিশনের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। বিগত নির্বাচনে সাত ধাপে মোট ৪,১১৪টি ইউপিতে ভোট গ্রহণ করতে সময় লেগেছিল ১৯৬ দিন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবার ধাপে ধাপে নির্বাচনের সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ করছে ইসি।
নির্বাচন পরিচালনা ব্যয়ের খাতগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৪৭ হাজার ভোটকেন্দ্রের বেষ্টনী, মেরামত ও গোপন কক্ষ তৈরিতে গতবার ১৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয় হলেও এবার ৪৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বরাদ্দও আগের চেয়ে বাড়ানো হয়েছে। এদিকে নির্বাচন সামনে রেখে আচরণ বিধিমালা সংস্কারের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং বর্তমানে ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ জন। ভোটার স্থানান্তর আবেদনের শেষ সময় ৭ সেপ্টেম্বর এবং নিষ্পত্তির সময় ১০ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিগত ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল মোট সাতটি ধাপে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ৩৬৮টি, দ্বিতীয় ধাপে ৮৪০টি, তৃতীয় ধাপে ১,০০০টি, চতুর্থ ধাপে ৮৩৭টি, পঞ্চম ধাপে ৭০৮টি, ষষ্ঠ ধাপে ২১৬টি এবং সপ্তম ধাপে ১৩৬টি ইউপিতে ভোট হয়। এছাড়া বিশেষ বা অষ্টম ধাপে আরো ৯টিসহ মোট ৪,১১৪টি ইউপির নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়েছিল। সে সময় পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ করতে ইসির সময় লেগেছিল ১৯৬ দিন বা প্রায় ছয় মাস।
একই ভাবে আড়াই হাজার রিটার্নিং অফিসারের জন্য আগে বরাদ্দ ছিল তিন কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এবার কর্মকর্তাপ্রতি ৫০০ টাকা বাড়িয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে চার কোটি ৪০ লাখ টাকা। ব্যালট পেপার মুদ্রণ, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স সরবরাহ, আচরণবিধি তদারকি এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় নির্বাহী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যয় কয়েকগুণ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

















