দীর্ঘদিন ধরে ভারতের ধনী শ্রেণির দাতব্য অনুদানের একটি বড় অংশ মন্দির ও বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দখলে থাকলেও, বর্তমানে এই চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দেশটির শীর্ষ শিল্পপতি ও ধনকুবেররা এখন মৌলিক বিজ্ঞান, উচ্চতর গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বড় অঙ্কের বিনিয়োগে মনোযোগ দিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের দীর্ঘমেয়াদী অগ্রগতির জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে।
এই পরিবর্তনের একটি উদাহরণ দেখা যায় গত বছর পদার্থবিদ জৈনেন্দ্র জৈনের অভিজ্ঞতায়। ২০২৫ সালের মর্যাদাপূর্ণ উলফ পুরস্কার জয়ী এই পদার্থবিদকে মুম্বাইয়ের রিয়েল এস্টেট খাতের শীর্ষ উদ্যোক্তা অভিষেক লোধা ফোন করে মুম্বাইয়ে প্রতিষ্ঠিতব্য নতুন ‘লোধা থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স ইনস্টিটিউট’-এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হওয়ার প্রস্তাব দেন। বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জৈনেন্দ্র জৈন জানান, আকাশচুম্বী ভবন নির্মাতা একজন ব্যবসায়ীর মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণায় অর্থায়নের এমন উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রে স্বাভাবিক মনে হলেও ভারতে এটি বেশ বিরল। লোধা গ্রুপের প্রধান অভিষেক লোধা জানিয়েছেন, নতুন এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলতে আগামী ৮ থেকে ১০ বছরে ১০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। তার প্রত্যাশা, এই বিনিয়োগ ভবিষ্যতে নতুন উদ্ভাবন ও শিল্পের বিকাশে সহায়ক হবে।
একইভাবে ভারতের অন্যান্য শীর্ষ উদ্যোক্তারাও গবেষণায় এগিয়ে আসছেন। রাজীব বাজাজ নারী প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের জন্য দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৃত্তি কর্মসূচি চালু করেছেন, যেখানে নির্বাচিত ছাত্রীদের ৮ লাখ রুপি পর্যন্ত সহায়তা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া ইনফোসিসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা কৃষ গোপালকৃষ্ণন মস্তিষ্ক গবেষণায় এবং কিরণ মজুমদার-শ ২০২২ সালে উন্নত জীববিজ্ঞান গবেষণার জন্য বিশেষ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেছেন। বেঙ্গালুরুর আরও অনেক প্রযুক্তি খাতের বিলিয়নিয়ার রোবোটিক জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে শুরু করে চিকিৎসা গবেষণার বিভিন্ন প্রকল্পে বিপুল অর্থ ঢালছেন।
কিরণ মজুমদার-শ মনে করেন, ভারতের হার্ভার্ড বা এমআইটির মতো বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দাতব্য সহায়তার ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে, কিন্তু এতদিন ভারতে ধারণা ছিল এসব কেবল সরকারের কাজ। এখন সেই ধারণা বদলাচ্ছে। স্বাধীনতার পর টাটা গ্রুপ যেভাবে বিজ্ঞান গবেষণায় অর্থায়নের পথ দেখিয়েছিল, বর্তমান প্রজন্ম আবার সেই ধারা ফিরিয়ে আনছে। দাতব্য সংস্থা দাসরা-এর নীরা নন্দী জানান, নতুন প্রজন্মের ধনী উদ্যোক্তারা প্রযুক্তিনির্ভর ও ফলাফলমুখী হওয়ায় তারা উদ্ভাবনে আগ্রহী। তবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের তুলনায় বিজ্ঞান গবেষণায় অর্থায়ন এখনও কম। ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতীয় ধনী পরিবারগুলোর ১৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত দানের সম্ভাবনা রয়েছে, যা গবেষণার পরিবেশ উন্নত করলে বিজ্ঞান খাতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

















