বন্যার পানি নামতে শুরু করলে মানুষের মনে সাময়িক স্বস্তি ফিরলেও প্রকৃত দুর্যোগের স্বরূপ তখনই উন্মোচিত হয়। পানি সরে যাওয়ার পর ভাঙা ঘর, বিধ্বস্ত সড়ক, নষ্ট ফসল এবং জীবিকা হারানোর বেদনাদায়ক দৃশ্য সামনে আসে। এবারের বন্যায় দেশের বিভিন্ন জেলায় পানি বাড়া বা কমার সাথে সাথে অব্যবস্থাপনা ও দুর্বল প্রস্তুতির চিত্রটি আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
নেত্রকোনার কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরে পানি নামতে শুরু করলেও মানুষের দুর্দশা কাটেনি। পাহাড়ি ঢলে সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আমনের বীজতলা ও মাছের খামার ভেসে গেছে, যা কৃষিনির্ভর মানুষের দীর্ঘমেয়াদী আয়ের ওপর প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে, লালমনিরহাটে তিস্তার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে নিম্নাঞ্চলে নতুন করে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা তৈরি করেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যারাজের জলকপাট খোলা রাখা হয়েছে।
সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর তীররক্ষা বাঁধ ধসে পড়ার ঘটনা নদী ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধানের ঘাটতিকে সামনে এনেছে। রংপুরের যমুনেশ্বরী নদীর পানি বৃদ্ধি ও ভাঙনের আশঙ্কা স্থানীয়দের উদ্বেগ বাড়িয়েছে, আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে মেঘনা নদীর ভাঙনে শতাধিক পরিবার গৃহহীন হওয়ার পথে। মৌলভীবাজারের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক; সেখানে বন্যায় শতাধিক কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭০ কোটি টাকা। যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনকে কেবল ত্রাণ বিতরণে সীমাবদ্ধ না রেখে অবকাঠামো পুনর্গঠন ও জীবিকা পুনরুদ্ধারে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিবছর বন্যার পুনরাবৃত্তি আমাদের প্রচলিত পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাত ও নদীর গতিপ্রকৃতি বদলে যাওয়ায় এখন বিজ্ঞানভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা, কার্যকর বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ ও দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ অপরিহার্য।
সরকারি সহায়তা হিসেবে কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি উপকরণ সরবরাহ এবং নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের স্থায়ী পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। স্থানীয় সরকার, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা জরুরি। দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করা বাংলাদেশের মানুষের জন্য নতুন কিছু নয়, তবে পরিকল্পিত প্রস্তুতি ও দীর্ঘমেয়াদী নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব। রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধ ও প্রস্তুতির ঘাটতি না থাকলে মানুষের দুর্ভোগের এই চক্র থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
















