বিশ্বফুটবলের মঞ্চে ফরাসিদের দাপট ও আবেগ বরাবরই অনন্য। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে দিদিয়ের দেশমের দল সেমিফাইনালে পৌঁছে যাওয়ার এই মুহূর্তে, ফরাসি ফুটবলের অন্দরমহলের কিছু ঐতিহাসিক ও অদ্ভুত ঘটনা ফিরে দেখা বেশ প্রাসঙ্গিক। ফরাসি ফুটবল মানেই মাঠের ভেতরের অবিশ্বাস্য দক্ষতা আর মাঠের বাইরের চরম নাটকীয়তার এক দারুণ সংমিশ্রণ।
ফরাসি ফুটবলের এমন অদ্ভুত ঘটনার শিকড় ১৯৫৮ সালে। কিংবদন্তি জাস্ট ফন্টেইন এক বিশ্বকাপে ১৩ গোল করে রেকর্ড গড়েছিলেন, যা আজও অজেয়। মজার বিষয় হলো, অনুশীলনে নিজের বুট ছিঁড়ে যাওয়ায় তিনি সতীর্থ স্তেফান ব্রুয়ের কাছ থেকে ধার করা জুতো পায়ে দিয়ে এই গোলগুলো করেছিলেন। টুর্নামেন্ট শেষে সেই বুট ফেরত দেওয়া ফরাসি ফুটবলের অন্যতম সেরা রম্য উপাখ্যান হয়ে আছে।
১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে প্রশাসনিক ভুলের কারণে হাঙ্গেরির বিপক্ষে ফ্রান্সকে স্থানীয় ক্লাব ‘অ্যাটলেটিকো কিম্বার্লি’-এর সবুজ-সাদা জার্সি পরে নামতে হয়েছিল। জার্সির স্বল্পতায় নম্বর বসানোর তাড়াহুড়োয় খেলোয়াড়দের জার্সির নম্বরের সাথে শর্টসের নম্বরের কোনো মিল ছিল না, তবুও ফরাসিরা ৩-১ গোলে ম্যাচটি জিতেছিল। এছাড়া ২০০৫ সালে ফ্রাঙ্ক জুরিয়েত্তি মাত্র ৫ সেকেন্ডের জন্য মাঠে নেমে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ক্যারিয়ারের রেকর্ড গড়েছিলেন। ২০০৫ সালের ১২ অক্টোবর বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে সাইপ্রাসের বিপক্ষে ফ্রান্স যখন ৪-০ ব্যবধানে এগিয়ে, তখন কোচ রেমোঁ দোমেনেখ ৯১তম মিনিটে তাকে বদলি হিসেবে মাঠে নামার নির্দেশ দেন।
কুসংস্কারের ক্ষেত্রে ১৯৯৮ সালে লরাঁ ব্লাঁ কর্তৃক গোলরক্ষক ফাবিয়েন বার্থেজের টাক মাথায় চুম্বন করার দৃশ্যটি আইকনিক হয়ে আছে, যা সেবার ফ্রান্সকে চ্যাম্পিয়ন হতে সাহায্য করেছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। ২০০৬ সালে কোচ রেমোঁ দোমেনেখ জ্যোতিষশাস্ত্র ও রাশিচক্রের ওপর ভরসা করে দল নির্বাচন করতেন, যা নিয়ে আজও বিতর্ক ও হাস্যরস রয়েছে। ২০১৮ সালের রাশিয়ায় আদিল রামির গোঁফে হাত বুলিয়ে ভাগ্য খোঁজার প্রথাও বেশ জনপ্রিয় ছিল।
তবে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে ফরাসিরা আর এসব কুসংস্কারের ওপর নির্ভর করছে না। তারা কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব আর নিখুঁত ফিনিশিংয়ে প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। ১৬ জুন সেনেগালকে ৩-১, ২২ জুন ইরাককে ৩-০ এবং ২৬ জুন নরওয়েকে ৪-১ গোলে হারিয়ে তারা গ্রুপ পর্বে দাপট দেখায়। নকআউটে সুইডেনকে ৩-০, প্যারাগুয়েকে ১-০ এবং কোয়ার্টার-ফাইনালে মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে তারা এখন সেমিফাইনালে। গোলরক্ষক মাইক মাইনিয়ান এই টুর্নামেন্টে টানা পাঁচটি ক্লিন শিট বজায় রেখেছেন। আগামী ১৪ জুলাই ডালাসে স্পেন বনাম ফ্রান্সের এই মহাকাব্যিক সেমিফাইনালে ফুটবল বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে, যেখানে ফরাসিরা টানা তৃতীয়বারের মতো ফাইনালে ওঠার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে।

















