সরকারি কেনাকাটার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনে সরকার ‘গণ খাতে ক্রয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে গত ২০ বছরে বিভিন্ন কারণে সরকারি দরপত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত ব্যক্তিদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এখানে সুযোগবঞ্চিত বলতে এমন ব্যক্তিদের বোঝানো হয়েছে, যাদের বৈধ লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও গত দুই দশকে অনুকূল পরিবেশের অভাবে সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গত রোববার মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর সোমবার আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় এই প্রজ্ঞাপন জারি করে। নতুন অধ্যাদেশে অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র এবং নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে যোগ্যতার শর্ত শিথিল করা হয়েছে। এতে নতুন, ক্ষুদ্র ও নারী দরপত্রদাতারা অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এলটিএমে আগে সর্বনিম্ন দর সমান হলে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত কাজে লটারির সুযোগ ছিল, তবে এখন ৩ কোটি টাকার নির্দিষ্ট সীমা বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
নতুন ঠিকাদারদের উৎসাহিত করতে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, কোনো কাজের জন্য প্রয়োজন না থাকলে দীর্ঘ ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা বা নির্দিষ্ট টার্নওভারের শর্ত বাধ্যতামূলক করা যাবে না। তবে কাজের ধরন ও ঝুঁকি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সক্ষমতার শর্ত রাখা যাবে। এছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা বা গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্বার্থে জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রচলিত ক্রয়পদ্ধতির সব ধাপ অনুসরণ না করেই ‘বিকল্প সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা’র অধীনে সরাসরি কেনাকাটার সুযোগ রাখা হয়েছে।
দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু দর নয়, বরং কাজের গুণগত মান, কারিগরি সক্ষমতা এবং টেকসই হওয়ার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সীমিত দরপত্র (এলটিএম) ব্যবহারের ক্ষেত্রগুলোও নির্দিষ্ট করা হয়েছে, যেখানে ক্ষুদ্র ও নারী উদ্যোক্তারা অগ্রাধিকার পাবেন। দুর্নীতি বা জালিয়াতির অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ হিসেবে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
তবে এই সংশোধন নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৫ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ঠিকাদারদের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতার প্রবণতা রয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, শীর্ষ ৫ শতাংশ ঠিকাদার মোট প্রকল্প মূল্যের ৬১ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, আর ১০ শতাংশ ঠিকাদারের দখলে রয়েছে ১ শতাংশের কম বাজার। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ২০ বছর ধরে সুযোগবঞ্চিতদের ব্যবসায় ফেরানোর যৌক্তিকতা থাকলেও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা বজায় রাখা জরুরি। তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকার যদি যথাযথ প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারে, তবে এটি কেবল সুবিধাভোগীদের হাতবদল হিসেবে গণ্য হতে পারে, যা দেশের জন্য কল্যাণকর হবে না।
















