কক্সবাজারের চকরিয়ায় বন বিভাগের আপত্তির মুখে শেষ মুহূর্তে থমকে দাঁড়িয়েছে গুরুত্বপূর্ণ খুটাখালী-ঈদগড় সড়ক নির্মাণ প্রকল্প। জাইকার অর্থায়নে দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়নাধীন এই সড়কটি চকরিয়া, রামু, নাইক্ষ্যংছড়ি ও লামাসহ আশপাশের পাঁচ উপজেলার অন্তত দুই লাখ মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ দুর্ভোগ লাঘবের স্বপ্ন দেখাচ্ছিল। ইতোমধ্যে প্রকল্পের দুটি প্যাকেজে ১৯ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হলেও সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণের অভিযোগ তুলে কাজ থামিয়ে দিয়েছে বন বিভাগ।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তথ্য অনুযায়ী, পুরো সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে চকরিয়া অংশে ১১ কিলোমিটার এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি অংশে পাঁচ কিলোমিটার। এই সড়কটির নির্মাণ কাজ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয় এবং আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তা শেষ হওয়ার কথা ছিল। বর্তমানে খুটাখালী বাজার থেকে মধুশিয়া এবং পশ্চিম দিকে ঈদগড় থেকে কালাপাড়া পর্যন্ত প্রায় ছয় কিলোমিটার সড়কের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে মধুশিয়া বনের ভেতর দিয়ে যাওয়ার বাকি পাঁচ কিলোমিটার অংশের কাজ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। বন বিভাগ অনাপত্তিপত্র না দেওয়ায় প্রকল্পটি বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়েছে, যা নিয়ে এলজিইডি ও বন বিভাগের মধ্যে বিপরীতমুখী অবস্থান তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কটির মাঝের অংশ অচল থাকায় স্থানীয়দের মাত্র পাঁচ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে প্রায় ২০ কিলোমিটার ঘুরতে হচ্ছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, যে বনাঞ্চল নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে, সেখানে অবাধে বালু উত্তোলন চলছে এবং বন বিভাগের লাল পতাকা থাকা সত্ত্বেও ডাম্পার চলাচল করছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের দাবি, এটি ব্রিটিশ আমলের একটি পুরনো রাস্তা এবং এখানে ব্রিটিশ আমল থেকেই ৩০-৪০ মিটার প্রশস্ত পথ ছিল। বর্তমানে ঘন গর্জন বন রয়েছে মাত্র ৫০০ থেকে ৭০০ মিটার এলাকায়। বাকি অংশে রয়েছে কৃষিজমি ও খোলা জায়গা, ফলে নতুন করে গাছ কাটার প্রয়োজন নেই।
স্থানীয় কৃষক কামাল উদ্দিন বলেন, সড়ক না থাকায় আমার ১৫ কানি জমিতে ঠিকমতো চাষাবাদ করতে পারি না। রাস্তা হলে উৎপাদন বাড়বে, সময়ও বাঁচবে। এখন ডাকাতি ও অপহরণের ভয়েও মানুষ ওই পথে যেতে চায় না। ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আবুল হোসেন বলেন, এখানে প্রায় ১৭ হাজার মানুষের বসবাস। একসময় এই সড়কে জিপ চলত। সড়কটি নির্মিত হলে মানুষের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আসবে।
বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মারুফ হোসেনের ভাষ্যমতে, প্রকল্পটি শুরু হওয়ার পর মাঝপথে তাদের কাছে অনাপত্তিপত্র চাওয়া হয়েছে। তিনি জানান, মধুশিয়ার গর্জন বন বিপন্ন এশীয় হাতির করিডোর হিসেবে পরিচিত। সেখানে সড়ক নির্মাণ হলে হাতির বিচরণ বাধাগ্রস্ত হবে এবং মানুষ-হাতি সংঘাতের ঝুঁকি বাড়বে।
অন্যদিকে, চকরিয়া উপজেলা এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী ফরিদুল আলম জানান, প্রকল্পের ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেসব অংশে কাজ হয়েছে সেখানে কোনো বনভূমি নেই এবং যে পাঁচ কিলোমিটার নিয়ে আপত্তি, সেখানেও বিদ্যমান রাস্তা রয়েছে। এছাড়াও সড়ক নির্মাণে প্রায় ২০ মিটার জায়গা প্রয়োজন হলেও সেখানে ৩০ থেকে ৪০ মিটার প্রশস্ত বিদ্যমান রাস্তা রয়েছে। ফলে কোনো গাছ কাটা ছাড়াই সড়কটি নির্মাণ সম্ভব, যা বন্যপ্রাণীর চলাচলে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।

















