১৯৭৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মাও সে-তুংয়ের মৃত্যু কেবল একজন বিপ্লবী নেতার জীবনাবসানের ঘটনা ছিল না, বরং এটি চীনের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তিকেও নির্দেশ করেছিল। তিন দশকের শাসনামলে মাও যে বিপ্লবী রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিলেন, তা একদিকে চীনকে ঐক্যবদ্ধ ও আমূল পরিবর্তিত করেছিল, অন্যদিকে দেশটি দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক নিপীড়ন, সামাজিক বিভাজন ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল। মার্কিন রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু জি ওয়াল্ডারের ২০১৫ সালে প্রকাশিত বই ‘চায়না আন্ডার মাও: আ রেভোল্যুশন ডিরেইলড’-এ ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতায় আসা থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত সময়ের ইতিহাস বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ওয়াল্ডারের মতে, যেসব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান মাওয়ের সাফল্যের ভিত্তি ছিল, পরবর্তী সময়ে সেগুলোই তাঁর বড় ব্যর্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৪৯ সালে গৃহযুদ্ধ শেষে কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আসার পর মাওয়ের নেতৃত্বে চীন নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর অধীনে আসে। এই সময় ভূমিসংস্কার, শিল্পের জাতীয়করণ এবং পরিকল্পিত অর্থনীতি প্রবর্তনের মাধ্যমে দেশটি নতুন করে সাজানোর কাজ শুরু হয়। ওয়াল্ডারের বিশ্লেষণে, কমিউনিস্ট পার্টির কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো এবং সোভিয়েত আদলের সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করে ফেলেছিল। এর ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সম্ভব হলেও ভুল সংশোধনের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। ১৯৫০-এর দশকে চীন দ্রুত শিল্পায়নের পথে এগোলেও মাও সোভিয়েত মডেলের আমলাতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। মস্কোর সাথে আদর্শগত বিরোধের জেরে তিনি নিজস্ব ও উগ্র সমাজতান্ত্রিক পথের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ১৯৫৬ সালের ‘শত ফুল ফুটুক’ নীতির ব্যর্থতার পর তিনি শ্রেণিসংগ্রামকেই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন।
১৯৫৮ সালে শুরু হওয়া ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ ছিল কৃষিনির্ভর চীনকে শিল্পোন্নত দেশে রূপান্তরের এক উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি। স্থানীয় কর্মকর্তাদের ওপর উৎপাদনের অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপের ফলে অতিরঞ্জিত হিসাব তৈরি হয়, যা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের দিকে ঠেলে দেয়। ‘হুকৌ’ বা কঠোর গৃহস্থালি নিবন্ধন ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রামের মানুষকে জমিতে আটকে রেখে শহরের চাহিদা মেটানোর চেষ্টার ফলে ১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এটি মাওয়ের শাসনামলের অন্যতম বড় ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত।
পরবর্তী সময়ে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও বিশেষজ্ঞ শ্রেণির উত্থান দেখে মাও শঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং একে ‘পুঁজিবাদী পুনঃস্থাপন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ১৯৬৬ সালে শুরু হয় সাংস্কৃতিক বিপ্লব। রেড গার্ডদের ব্যবহারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রচলিত কাঠামোতে আঘাত করা হয়, যা স্কুল-কলেজ বন্ধ এবং ব্যাপক নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটায়। ওয়াল্ডারের গবেষণায় এই বিপ্লবের সহিংসতায় ১১ থেকে ১৬ লাখ মানুষের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত চীন কার্যত সামরিক শাসনের অধীনে চলে যায়, যার নেতৃত্বে ছিলেন লিন বিয়াও। মাওয়ের ব্যক্তিপূজা ও সমালোচনার সুযোগ না থাকায় ভুল নীতি সংশোধন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
সবশেষে, মাওয়ের অবদানকে অস্বীকার করার উপায় নেই। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত চীনকে একটি কেন্দ্রীয় শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন, শিল্পায়ন ও সামাজিক কাঠামোর ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিলেন। কিন্তু এই অগ্রগতির মূল্য ছিল আকাশচুম্বী। ১৯৭৬ সালে মাওয়ের মৃত্যুর পর ‘গ্যাং অব ফোর’ গ্রেপ্তার হয় এবং দেং শিয়াওপিংয়ের নেতৃত্বে চীন ভিন্ন অর্থনৈতিক পথে যাত্রা শুরু করে। ওয়াল্ডারের মতে, মাওয়ের ট্র্যাজেডি এখানেই যে, তিনি এমন এক রাষ্ট্র তৈরি করেছিলেন যেখানে তাঁর নিজের ভুলগুলো প্রশ্ন করার মতো কোনো কার্যকর রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ছিল না। ১৯৮১ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ঐতিহাসিক মূল্যায়নে সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে গুরুতর ভুল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। একটি বিপ্লব যখন নিজের ভুল স্বীকার করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, তখন তা সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে—এটিই মাওয়ের চীনের ইতিহাসের বড় শিক্ষা।

















