র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে বিল আনা হয়েছে। এই বিল উত্থাপন নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বিতর্ক হয়। বিরোধী দল অভিযোগ তুলেছে যে, র্যাব বিলুপ্ত করা হলেও প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী এসআরবি কার্যত র্যাবের মতোই একটি বাহিনী হবে।
বিতর্ক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন করেন। পরে বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য চার কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।
মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত আইনের খসড়া পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কাগজে-কলমে ‘র্যাব’ বিলুপ্ত হলেও বাহিনীটির প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার প্রায় সবই নতুন এসআরবিতে স্থানান্তরিত হবে। র্যাবের বর্তমান জনবল, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, সুবিধা, তহবিল, সম্পত্তি, হিসাব, নথি ও অন্যান্য সম্পদ এসআরবিতে চলে যাবে। র্যাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নতুন ইউনিটের সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন। এমনকি র্যাবের দায়দায়িত্ব, চুক্তি এবং পক্ষে বা বিপক্ষে চলমান মামলাও এসআরবির নামে পরিচালিত হবে।
২০০৩ সালে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিন্যান্স’ সংশোধন করে র্যাব গঠনের আইনি ভিত্তি দেওয়া হয়েছিল। তবে নানা কর্মকাণ্ডের কারণে বাহিনীটি সমালোচিত হয়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর র্যাব এবং বাহিনীটির সাবেক ও তৎকালীন সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘ, গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো অতীতে বিভিন্ন সময়ে বাহিনীটি বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছিল। এখন ওই অধ্যাদেশের র্যাব-সংক্রান্ত বিধান বাদ দিয়ে র্যাব বিলুপ্ত এবং পৃথক এসআরবি আইন করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত এসআরবি বিলে বলা হয়েছে, এটি পুলিশ বাহিনীর অধীন একটি বিশেষায়িত ইউনিট হবে। সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ ও শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে নির্ধারিত সংখ্যক কর্মকর্তা, সশস্ত্র সদস্য বা কর্মচারীকে পদায়ন কিংবা প্রেষণে নিয়োগ দিয়ে এই ইউনিট গঠন করবে। ইউনিটটির কর্মকর্তা, সশস্ত্র সদস্য ও কর্মচারীদের পদবিন্যাস, নিয়োগপদ্ধতি এবং চাকরির শর্তাবলি বিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে। এসআরবির জন্য বিধি দ্বারা নির্ধারিত পতাকা, প্রতীক ও স্বতন্ত্র পোশাক থাকবে। পুলিশে কর্মরত অন্তত অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা এসআরবির মহাপরিচালক হবেন।
বিলে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, র্যাবের জনবল, আদেশ, ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব, বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা, তহবিল, নগদ ও ব্যাংকে জমা অর্থ, দায়, চুক্তি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, রেজিস্টার, রেকর্ডপত্রসহ সব দলিল এসআরবিতে স্থানান্তরিত হবে। নতুন আইনের বিধিমালা প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত ২০০৫ সালের বিদ্যমান বিধিমালার অধীনে র্যাব-সংক্রান্ত বিভাগীয় শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা ও আদালতের কার্যধারা বহাল থাকবে। এসআরবিকে ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত, তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও জব্দের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার বিধানও রাখা হয়েছে। আইনের খসড়ায় নাগরিকদের অভিযোগ এবং ইউনিটের সদস্যদের অভ্যন্তরীণ সংক্ষোভ নিষ্পত্তির জন্য একটি বহুপক্ষীয় অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের বিধানও রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি সংসদে তুলতে গেলে আপত্তি জানান বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও আয়নাঘরের কারণে র্যাব জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি সহ সব রাজনৈতিক দল র্যাব বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তখন র্যাবের মতো আরেকটি প্রতিষ্ঠান গঠনের কথা বলেনি। এখন নতুন মোড়কে র্যাব পুনর্গঠন করা হচ্ছে। নাহিদ ইসলাম মন্তব্য করেন, ‘র্যাব ফ্যাসিবাদের চিহ্ন’ এবং র্যাব বিলুপ্ত করা হোক। তিনি আরও বলেন, আরেকটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করতে হলে আগে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা করা হোক।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নাহিদ ইসলাম অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। তখন উপদেষ্টা পরিষদে নাহিদ এই প্রস্তাব দিলে তিনি খুশি হতেন। তিনি বলেন, পুলিশের প্রধান ছিলেন ‘কুখ্যাত বেনজীর’, সে জন্য কি পুলিশ বিলুপ্ত করে দেওয়া হবে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল র্যাব নামে কোনো সংগঠন থাকবে না, সেটি বিলুপ্ত করা হচ্ছে। তবে পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিট দরকার।
এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, তাঁরা র্যাব বিলুপ্তির প্রস্তাব সমর্থন করেন। কিন্তু নতুন একটি সংস্থা গঠনের বিষয়ে আরও চিন্তাভাবনা করে সবার সম্মতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। তিনি বিষয়টি বিবেচনার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এসআরবির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বিলে এবং তিনি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিলটি নিয়ে আলোচনায় অংশ নিতে বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানান।
বিতর্কের একপর্যায়ে বিলটি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সংসদীয় কমিটিকে চার-পাঁচ দিন সময় দেওয়ার আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিলটি উত্থাপন করেন এবং এটি চার কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়।
এর আগে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিন্যান্স’ রহিত করে নতুন আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বিলটিও পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। প্রস্তাবিত এপিবিএন আইনে এপিবিএনকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধি ও প্রচলিত অন্যান্য আইন মেনে কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তার করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। বিলে বলা হয়েছে, পুলিশ বাহিনীর অধীন এপিবিএন গঠিত ও পরিচালিত হবে। এই ইউনিটে স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন, পার্বত্য ব্যাটালিয়ন, বিমানবন্দর ব্যাটালিয়ন এবং অন্য কোনো ব্যাটালিয়ন অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বিলে আরও বলা হয়েছে, এ ইউনিটের কোনো সদস্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম বা সংবাদপত্রে কোনো তথ্য কিংবা দলিল প্রকাশ করতে পারবেন না।

















