চট্টগ্রামের রাউজানে আবারও প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাউজানের কেরানীহাট বাজারে মোহাম্মদ করিম (৩৫) নামের এক যুবদল কর্মীকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করেছে একদল অস্ত্রধারী। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চার-পাঁচটি মোটরসাইকেলে করে আসা হামলাকারীরা করিমকে ঘিরে ফেলে এবং কিরিচ দিয়ে তাঁর ঘাড় ও মাথায় আঘাত করে। পরে তিনি মাটিতে পড়ে গেলে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে হামলাকারীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। আতঙ্কে স্থানীয় লোকজন প্রায় এক ঘণ্টা মৃতদেহটি সরানোর সাহস পাননি। পরে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে। পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদন অনুযায়ী, করিমের পেট, ঊরু ও নিতম্বে গুলির চিহ্ন রয়েছে এবং ঘাড় ও কপালে কোপের দাগ পাওয়া গেছে।
নিহত মোহাম্মদ করিমের পরিবার হাটহাজারীর আমানবাজার এলাকায় বসবাস করে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, করিম একসময় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতেন এবং পরে বিদেশেও গিয়েছিলেন। দেশে ফেরার পর তিনি মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর বিরুদ্ধে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণসহ অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে। শুক্রবার ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। করিমের স্ত্রী বিলকিস আকতার জানান, কয়েক দিন ধরে কিছু সন্ত্রাসী তাঁকে ফোন করে গ্রামের একটি বৈঠকে ডাকার চেষ্টা করছিল এবং বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর হত্যার শিকার হন।
এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে সন্ত্রাসী রায়হানের নাম উঠে আসছে। গত ২০ আগস্ট রায়হান নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে পুলিশকে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ বলে হুমকি দিয়েছিলেন। ঘটনার ১০ দিনের মাথায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটল। হত্যাকাণ্ডের ছয় ঘণ্টা পর রায়হান নিজের ফেসবুক স্টোরিতে গুলি ছোড়ার একটি ভিডিও আপলোড করেন। স্থানীয়রা মনে করছেন, সন্ত্রাসী রায়হান পুলিশকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছেন। গত ২৯ জুলাই নোয়াখালীতে পুলিশের অভিযানের সময় রায়হান পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পলাতক এই সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা রয়েছে। এছাড়া ১৩ জুন রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরী হত্যাকাণ্ডের নির্দেশেও রায়হানের নাম এসেছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে রাউজানে ২৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ২০টিই রাজনৈতিক বিরোধের জেরে। একই সময়ে শতাধিক সংঘর্ষে সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম জানান, রায়হানসহ জড়িতদের ধরতে অভিযান চলছে এবং জামিনে থাকা সন্ত্রাসীদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে করিমের হত্যাকাণ্ডে কোনো নির্দিষ্ট সন্ত্রাসী বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা এখনো পাওয়া যায়নি বলে তিনি দাবি করেন। চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপুলিশ পরিদর্শক মো. নাজিমুল হক জানান, রাউজানে আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নে চারটি এপিবিএন ক্যাম্প স্থাপন, এআই ক্যামেরা ও থার্মাল ড্রোন ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের সাবেক সভাপতি মো. সাখাওয়াত হোসেন পুলিশের গোয়েন্দা তথ্য ও সোর্সব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের রাজনৈতিক আশ্রয় বন্ধ করার ওপর জোর দিয়েছেন।

















