বিশ্ব বাঘ দিবস উপলক্ষ্যে সুন্দরবনে কৃত্রিম পুকুর খনন, বাঘের কেল্লা নির্মাণ এবং প্রযুক্তিভিত্তিক নজরদারির মাধ্যমে বাঘ সংরক্ষণের বিভিন্ন সাফল্যের কথা প্রচার করছে বন বিভাগ। তবে কর্তৃপক্ষের এসব দাবির বিপরীতে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। গবেষক, উপকূলীয় বাসিন্দা এবং বনজীবীদের মতে, বন বিভাগের পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির বড় ধরনের ফারাক রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব, খাদ্য সংকট এবং বনদস্যু ও চোরাশিকারিদের গোপন তৎপরতায় সুন্দরবনের বাঘ এখন চতুর্মুখী অস্তিত্ব সংকটের মুখে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সুন্দরবনের সার্বিক পরিবেশ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। লোনা পানির আধিক্য বাড়ছে, নদীভাঙন দেখা দিচ্ছে এবং পলি জমে ভেতরের খাল ও নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বারবার ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে বনের ভৌগোলিক আয়তন সংকুচিত হচ্ছে। মিঠাপানির তীব্র সংকটে কেবল উদ্ভিদ নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রই ব্যাহত হচ্ছে। হরিণসহ অন্যান্য তৃণভোজী প্রাণীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় খাদ্যশৃঙ্খলে বড় ধস নেমেছে, যার মাশুল গুনতে হচ্ছে বনের মূল শিকারি বাঘকে। শ্যামনগরের গাবুরা এলাকার দীর্ঘদিনের বনজীবী নুর ইসলাম জানান, আগে বনের কিনারায় হরিণের পাল ও বাঘের আনাগোনা দেখা গেলেও, এখন পুরো বন যেন নিস্তব্ধ ও প্রাণহীন হয়ে পড়ছে।
নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে গভীর উদ্বেগ। হরিনগর এলাকার জেলে আকবর আলী জানান, বনের ভেতর দস্যুদের আনাগোনা এখনও রয়েছে, যারা জেলেদের আটকে চাঁদা আদায় করে। এছাড়া বন্যপ্রাণী শিকারের ঘটনাও ঘটছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দস্যু ও চোরাশিকারি চক্র বনের ভেতরে সক্রিয়। দুইয়ের দশকে যেখানে বাঘের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০০টি, তা দস্যু ও শিকারিদের তাণ্ডবে এক পর্যায়ে ১০০-র কোঠায় নেমে আসে। বনজীবীদের দাবি, একটি বাঘ শিকার করে ভারতে পাচার করতে পারলে তা অন্তত ৭ লাখ টাকায় বিক্রি হয়, যা চোরাশিকারিদের প্রধান লক্ষ্য।
গবেষণা অনুযায়ী, একটি পূর্ণাঙ্গ বাঘের মুক্ত বিচরণের জন্য ১৪ থেকে ১৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্রয়োজন। কিন্তু বনাংশ ক্ষতিগ্রস্ত ও খাদ্যসংকট তীব্র হওয়ায় বাঘ প্রায়ই লোকালয়ে চলে আসছে, যা মানুষ-বাঘের সংঘাত বাড়াচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সাতক্ষীরা উপকূলেই বন্যপ্রাণীর হামলায় ১৭২ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১৬৮ জনই বাঘের আক্রমণে মারা গেছেন। নিহতদের ৬০ শতাংশ মৌয়াল, ২২ শতাংশ বাউয়াল এবং ১৮ শতাংশ জেলে ছিলেন।
জাতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কমিশনের সদস্য ও অধ্যাপক ড. এম মনিরুল এইচ খান মনে করেন, বাঘ সংরক্ষণকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। লবণাক্ততা, মিঠাপানির অভাব এবং শিকারি প্রাণীর সংখ্যা হ্রাস—সবই বাঘের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। সাতক্ষীরার নাগরিক নেতা মাধব দত্তের মতে, উপকূলীয় মানুষের বিকল্প আয়ের উপায় সীমিত হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে বনে যান। বননির্ভরতা না কমালে বনের ওপর চাপ কমবে না এবং কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া চোরাশিকার থামানো অসম্ভব।
বন বিভাগের তথ্যমতে, ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সুন্দরবনে অন্তত ৬২টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। বাঘ হত্যা ও পাচারের অভিযোগে ১৯টি মামলা হলেও ১০টির রায় হয়েছে এবং প্রমাণের অভাবে ৬টি মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছে। তবে বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা সুলজ কুমার দ্বীপ জানান, মিঠাপানির সংকট দূর করতে কৃত্রিম পুকুর খনন ও প্রযুক্তির ব্যবহারে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তার দাবি, এসব তৎপরতার ফলেই বাঘের সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে প্রায় ১২৫টিতে পৌঁছেছে।

















