আফ্রিকার ফুটবল মানচিত্রে মরক্কো এখন আর কোনো বিস্ময় নয়, বরং এক প্রতিষ্ঠিত শক্তি। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে খেলে ইতিহাস গড়া এই দলটি এবার ৪৮ দলের টুর্নামেন্টে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করেছে। একসময় তাদের সাফল্যকে রূপকথা মনে হলেও, এখন তারা নিজেদেরকে বিশ্বকাপের শিরোপার দাবিদার হিসেবে দেখছে।
বিশ্বকাপে আফ্রিকান দলগুলোর মধ্যে মরক্কোর রেকর্ড অনন্য। আফ্রিকার আর কোনো দল মরক্কোর চেয়ে বেশি বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় ওঠেনি, কোয়ার্টার ফাইনালেও বেশিবার খেলেনি। এমনকি ২০২২ সালে সেমিফাইনালে খেলে তারা আফ্রিকার সর্বোচ্চ সেমিফাইনাল খেলা দলের তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছে। এবার কানাডাকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করার মাধ্যমে তারা নিজেদের এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে মরক্কোর জয় এখন চারটি, যা আফ্রিকার বাকি সব দেশের নকআউট জয়ের সমান। ক্যামেরুন (১৯৯০), সেনেগাল (২০০২), ঘানা (২০১০) এবং মিসর (২০২৬) মিলে চারটি জয় পেয়েছে, যেখানে মরক্কো একাই চারটি জয় তুলে নিয়েছে। এছাড়া, বিশ্বকাপের দুটি ভিন্ন আসরে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা প্রথম আফ্রিকান দলও এখন তারাই।
চলতি বিশ্বকাপে মরক্কোর পথচলা অবশ্য পুরোপুরি মসৃণ ছিল না। গ্রুপ পর্বে প্রথম ম্যাচেই ব্রাজিলের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে তারা। এরপর স্কটল্যান্ডকে ১-০ এবং হাইতিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে নকআউটে জায়গা করে নেয়। শেষ ৩২-এর খেলায় নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে টাইব্রেকারে জয় ছিনিয়ে নেয় তারা, আর শেষ ষোলোয় কানাডাকে টপকে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে। তাদের এই বিশ্বকাপ-যাত্রায় কিছুটা অসংগঠিত মনে হলেও, কোনো ম্যাচে দুর্দান্ত আবার কোনো ম্যাচে ছন্নছাড়া পারফরম্যান্সের মধ্য দিয়ে তারা এগিয়ে চলেছে।
২০২২ সালে ওয়ালিদ রেগুরাইয়ের অধীনে মরক্কোর সাফল্যের মূল ভিত্তি ছিল রক্ষণের দৃঢ়তা। সেই দলে স্পেন ১২০ মিনিট খেলেও গোল করতে পারেনি, পর্তুগালও ব্যর্থ হয়েছিল এবং ফ্রান্সের বিপক্ষেও তারা শেষ পর্যন্ত লড়েছিল। তবে সেই দলে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেদ করার মতো কোনো সৃষ্টিশীল প্লেমেকারের অভাব ছিল। ওয়ালিদ বিদায় নেওয়ার পর গত মার্চে দায়িত্ব নেওয়া কোচ উয়াহবি, যিনি দীর্ঘদিন মরক্কোর বয়সভিত্তিক ফুটবলে কাজ করেছেন, তার পছন্দ আক্রমণাত্মক ফুটবল। এতে রক্ষণের সেই সংহতি কিছুটা কমলেও, আক্রমণে যোগ হয়েছে নতুন ধার।
বর্তমান দলে সেই ঘাটতি অনেকটাই পূরণ করেছেন রিয়াল মাদ্রিদের মিডফিল্ডার ব্রাহিম দিয়াজ। ব্রাজিলের বিপক্ষে ড্র এবং স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ে (সাইবারির গোলে) তিনি অ্যাসিস্ট করেছেন, কানাডার বিপক্ষেও করেছেন জোড়া অ্যাসিস্ট। তার উপস্থিতি মরক্কোর আক্রমণভাগে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
দিয়াজের পাশাপাশি আক্রমণে জ্বলে উঠেছেন আজ্জেদিন উনাহিও। ২০২২ সালে স্পেনকে টাইব্রেকারে বিদায় করার পর তৎকালীন স্পেন কোচ লুইস এনরিকে তাকে দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। এখন আর উনাহি কারো কাছে বিস্ময় নন। কানাডার বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি নিজের পরিচয় আরও একবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। গত মৌসুমে জিরোনার হয়ে দুর্দান্ত খেলার পর তাকে নিয়ে বড় ক্লাবগুলোর আগ্রহও স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে।
রক্ষণেও পিছিয়ে নেই আশরাফ হাকিমি। পিএসজির হয়ে টানা দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে আসা এই রাইটব্যাক বর্তমানে তার পজিশনের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। মরক্কো দলে তার ভূমিকা আক্রমণেও বিস্তৃত। এবারের আসরে তিনি ৩টি অ্যাসিস্ট করে ফেলেছেন। ১৯৬৬ সালের পর থেকে এক বিশ্বকাপে এর চেয়ে বেশি অ্যাসিস্ট আছে মাত্র তিনজন ডিফেন্ডারের – ডেলি ব্লাইন্ড, ডেনজেল ডামফ্রিস এবং কাফু (চারটি করে)।
মাঠে মরক্কোর এই সাফল্যের বীজ বোনা হয়েছিল অনেক আগে। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে চারটি বিশ্বকাপের তিনটিতে খেলার পর মরক্কো প্রায় দুই দশক বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারেনি। ২০০৯ সালে কিং মোহাম্মদ ষষ্ঠের নামে জাতীয় ফুটবল একাডেমি এবং ২০১৯ সালে প্রায় ৬৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে আধুনিক জাতীয় প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্স চালু হয়। এই দুটি প্রকল্প দেশটির ফুটবলকে বদলে দেয়। একদিকে স্থানীয় প্রতিভা গড়ে ওঠে, অন্যদিকে ইউরোপে জন্ম নেওয়া মরক্কান বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের জাতীয় দলে আনার কাজও সহজ হয়। আশরাফ হাকিমি ও ব্রাহিম দিয়াজ স্পেনে বড় হয়েছেন, আবার কেউ কেউ ফ্রান্স, বেলজিয়াম কিংবা নেদারল্যান্ডসের ফুটবল সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠেছেন।
জাতীয় দলে এসে সবাই একই পরিচয়ে খেলেন এবং হয়ে ওঠেন বিস্ময়। তবে কোচ উয়াহবির দাবি, “আজ আমরা আর কোনো চমক নই। মানুষ যখন মরক্কোর কথা বলে, তারা একটা প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী দলের কথাই বলে, একটা বড় ফুটবল-শক্তির কথা বলে, আর এটা আমাদের জন্য বিশাল গর্বের।” বিশ্বকাপের আগেও তিনি বলেছিলেন, “২০২২ বিশ্বকাপের পর মরক্কো নতুন এক মাত্রায় প্রবেশ করেছে। এখন আমাদের বিশ্বাস করতে হবে যে আমরা শিরোপার দাবিদার হতে পারি। সেরা হওয়ার জন্য যা যা লাগে, তার সবই আমাদের আছে। শুধু সেটা বিশ্বাস করাটাই বাকি।”
এই বিশ্বাসের ভিত্তি কেবল আত্মবিশ্বাস নয়, মাঠের পারফরম্যান্সও। ব্রাজিলের সঙ্গে সমানতালে লড়াই, নেদারল্যান্ডসকে বিদায় এবং কানাডার বিপক্ষে খুব ভালো না খেলেও ৩-০ গোলের জয় তাদের বড় দল হওয়ার লক্ষণই বলছে। বিশ্বকাপ জিততে শুধু প্রতিভা লাগে না, লাগে অভিজ্ঞতা, মানসিক শক্তি, কৌশলগত বৈচিত্র্য, গভীর স্কোয়াড এবং বড় মুহূর্তে ঠান্ডা মাথা। মরক্কোর এখন সব উপাদানই কমবেশি আছে। ২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কো ছিল অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প। এবার তাদের লক্ষ্য শুধু ইতিহাস গড়া নয়; আফ্রিকার ফুটবলকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্নকে আর রূপকথা বলে মনে হবে না। আর যদি সত্যিই কোনো আফ্রিকান দল প্রথমবার বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরে, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিটা সম্ভবত মরক্কোরই।

















