নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস সামিটে বিশ্বের তিন প্রভাবশালী নেতা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একমঞ্চে মিলিত হয়েছেন। টেকসই আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়োজিত এই সম্মেলনে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর সরকার প্রধান ও প্রতিনিধিরা অংশ নিলেও সবার নজর ছিল এই তিন নেতার দিকে। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে আঞ্চলিক ঐক্য ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে ভারত ও চীনের বড় দায়বদ্ধতা রয়েছে, যা এই সামিটে প্রতিফলিত হয়েছে। সম্মেলনের শেষ দিনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গ্লোবাল সাউথ ও উদীয়মান বাজারের দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনের ওপর জোর দিয়ে ৫ দফা পরিকল্পনা উত্থাপন করেন। সেগুলো হলো- ১. উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উদ্যোগ, ২. বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজীকরণ উদ্যোগ, ৪. বুদ্ধিমান উৎপাদন বা স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে সহযোগিতা উদ্যোগ ও ৫. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে প্রতিভা উন্নয়ন উদ্যোগ।
সম্মেলনটিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও কিছু প্রশ্নচিহ্ন রয়ে গেছে। বিশেষ করে, সম্মেলনের প্রথম দিন শনিবার রাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আয়োজিত নৈশভোজে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং আবু ধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহামেদসহ কয়েকজন নেতা অনুপস্থিত ছিলেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, দীর্ঘ দিনের ব্যস্ততা ও ক্লান্তির কারণে শি জিনপিং নৈশভোজে অংশ নিতে পারেননি। তবে এই ব্যাখ্যা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সম্মেলনের শেষ দিনে নরেন্দ্র মোদি ও শি জিনপিং দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন, যেখানে তারা পারস্পরিক মতপার্থক্যকে বিরোধে রূপ না দেওয়ার বিষয়ে একমত পোষণ করেন এবং ২০২৫ সালের আগস্টের পর থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রগতিকে স্বাগত জানান।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্মেলনে ব্রিকসের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের কথা উল্লেখ করেন। এতে যোগ দেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রমুখ। তিনি ব্রিকসের নিজস্ব পেমেন্ট ব্যবস্থা, ডিপোজিটরি অবকাঠামো, পুনর্বীমা ব্যবস্থা এবং একটি গ্রেইন এক্সচেঞ্জ বা শস্যবাজার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন। এদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কাছে ইরান আত্মসমর্পণ করবে না। তবে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেয়নি বাংলাদেশ। আমন্ত্রণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে এই সম্মেলনে যোগ দেননি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বা তার কোনো প্রতিনিধি। তবে ১২ ও ১৩ই সেপ্টেম্বর দুইদিনের এ সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছিল।
সম্মেলনের প্রথম দিনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সদস্য দেশগুলো সর্বসম্মতিক্রমে একটি যৌথ ঘোষণা গ্রহণ করেছে। ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ নামে পরিচিত এই বিবৃতিতে সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি, বাণিজ্য বিকৃতকারী একতরফা শুল্ক আরোপের বিরুদ্ধেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। আয়োজক ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মন্তব্য করেছেন যে, ব্রিকস এখন একটি পরিণত অবস্থানে পৌঁছেছে এবং বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও ডব্লিউটিও-র মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনে জোটটির প্রভাব বাড়ানোর সময় এসেছে। ১১টি সদস্য দেশ ও ১০টি পার্টনার দেশকে নিয়ে আয়োজিত এই সম্মেলন বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

















