গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে স্বামী মো. সিয়াম আল মুরসালিন আকাশের (৩০) নির্যাতনে আল মাইদা আক্তার (২০) নামের এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে নেওয়ার পর মাইদাকে মৃত ঘোষণা করা হলে স্বামী সিয়াম পালিয়ে যান, তবে স্থানীয়রা তাকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। মৃত্যুর মাত্র দুই দিন আগে মাইদা তার খালাতো বোনকে মারধরের শিকার হওয়ার ছবি পাঠিয়েছিলেন, যেখানে তার গালে ব্যান্ডেজ ও চোখ ফোলা দেখা যায়। সেই ছবিতে মাইদা লিখেছিলেন, ‘আপা, ও আমাকে আজও মারছে।’
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে প্রেমের সম্পর্ক থেকে সিয়াম ও মাইদার বিয়ে হয়। তাদের সংসারে চার ও এক বছর বয়সী দুটি ছেলেসন্তান রয়েছে। মাইদা পলাশবাড়ী সরকারি কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। দুই ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছোট ছিলেন; তার ভাই চীনে পড়াশোনা করেন। মাইদার বাবা শাহাজাদা মিয়ার মৃত্যুর পর মা মোছা. রহিমা খাতুন (৪৮) ভূমি অফিসে দলিল লেখার কাজ করে দুই সন্তানকে বড় করেছেন।
মাইদার মা রহিমা খাতুন আহাজারি করে জানান, বিয়ের পর থেকেই সিয়াম তার মেয়েকে মারধর করতেন। এ নিয়ে একবার সালিসও হয়েছিল, যেখানে সিয়াম বলেছিলেন, ‘পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর একটু সমস্যা হতেই পারে। এসব মেনে নিতে হবে।’ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে জামাতা সিয়াম তাকে ফোন করে জানান যে মাইদা অসুস্থ এবং পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আছেন। হাসপাতালে গিয়ে রহিমা খাতুন দেখেন তার মেয়ে আর বেঁচে নেই এবং জামাতা লাশ রেখেই পালিয়েছেন। মেয়েকে হত্যার অভিযোগে শুক্রবার তিনি জামাতা সিয়ামসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনের বিরুদ্ধে পলাশবাড়ী থানায় মামলা করেছেন।
মাইদার খালাতো বোন মোসাম্মৎ শাফিয়া প্রথম আলোকে জানান, সিয়ামের মা-বাবা বেঁচে নেই এবং একমাত্র বোন কাতারে থাকেন। মাইদা প্রায়ই তাকে ফোন করে স্বামীর মারধরের কথা জানাতেন। শেষবার মৃত্যুর দুই দিন আগে তিনি মারধরের ছবি পাঠিয়েছিলেন। শাফিয়া তাকে সংসার ছেড়ে চলে আসতে বললে মাইদা সন্তানদের ছোট হওয়ার কথা বলে কষ্ট নিয়ে বড় হওয়ার আশঙ্কায় রাজি হননি। শাফিয়া আরও দাবি করেন, মাইদার চার বছরের সন্তানের কাছ থেকে তারা শুনেছেন, ‘মাকে বাবা অনেক মেরেছে। পরে ফ্যানে ঝুলিয়ে দিয়ে সুইচ ছেড়ে দিয়েছে। পরে বাবার বন্ধুরা ফ্যান থেকে মাকে নামিয়ে আনে।’ এরপর সিয়াম নিজেই মাইক্রোবাস চালিয়ে মাইদাকে হাসপাতালে নিয়ে যান বলে শাফিয়া জানান। পলাশবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সারওয়ার আলম খান বলেন, মাইদার গলায় দাগ ও পুরোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে। সিয়াম পুলিশের কাছে বলেছেন, বিকেলে তাদের মধ্যে মারপিট হয়, এরপর মাইদা ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস দেন এবং তার বন্ধুরা মিলে অচেতন দেহ নামিয়ে আনেন।
মাইদার দুই শিশুসন্তান এখন নানির কাছে আছে, যার মধ্যে ছোট ছেলেটি বুকের দুধ না পেয়ে সারা দিন কান্নাকাটি করছে। এদিকে, মাইদার মৃত্যুর আলোচনা শেষ না হতেই মুক্তা ইসলাম নামের আরেক নারীর মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসে। গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মুক্তাকে খাটের সঙ্গে বেঁধে বেল্ট দিয়ে পেটাচ্ছেন তার স্বামী সোহেল শিকদার। পাশের কক্ষে সন্তানদের কান্নাকাটি শুনে মুক্তা স্বামীকে বলেন, ‘আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি।’ মারতে মারতে সোহেল বলছিলেন, ‘কথা ক, কথা ক, তোরে আজ পিটাইয়া মাইরা ফালামু।’ সোহেল শিকদার এই ভিডিও মুক্তার ভাই তানভীর রহমানের মুঠোফোনে পাঠিয়ে লিখেছিলেন, ‘তোমার বোনকে নিয়ে যাও।’ গত ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর খিলক্ষেতের বাসা থেকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় মুক্তার লাশ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, নির্যাতনের পর মুক্তাকে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই দুটি ঘটনা স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া দুটি মৃত্যুর ইঙ্গিত দেয় যে, উভয় নারীই স্বামীর কাছে নিয়মিত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং সংসার টিকিয়ে রাখতে নির্যাতন সহ্য করেছেন, যার শেষ পরিণতি হয়েছে মৃত্যু। নারী অধিকারকর্মীরা মনে করেন, পারিবারিক সহিংসতাকে অপরাধ না ভেবে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার কারণেই নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত আট মাসে নারী নির্যাতনের মোট ২৭ হাজার ৯১১টি কল এসেছে। এর মধ্যে স্বামীর হাতে নির্যাতনের অভিযোগ ১৭ হাজার ১৯৬টি, যা মোট অভিযোগের প্রায় ৬২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৭০টি কল আসছে স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে। গত বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত মোট কলের প্রায় ৫৮ শতাংশ ছিল স্বামীর বিরুদ্ধে।
গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, প্রায় ৭০ শতাংশ নারী তাদের জীবদ্দশায় অন্তত একবার হলেও জীবনসঙ্গী বা স্বামীর হাতে শারীরিক, যৌন, মানসিক ও অর্থনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন। জরিপের আগের ১২ মাসে ৪১ শতাংশ নারীর ক্ষেত্রে এই সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ২০১৫ সালের প্রতিবেদনে ৭৩ শতাংশ এবং ২০১১ সালের প্রতিবেদনে ৮০ শতাংশ নারী স্বামীর হাতে সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। মাইদার ঘটনাটি গত বছরের আগস্ট মাসে রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় সৈয়দা ফাহমিদা তাহসিনের (কেয়া) মৃত্যুর ঘটনাকেও মনে করিয়ে দেয়। সে সময় স্বামী সিফাত আলী ফাহমিদা অসুস্থ জানিয়ে তার মা-বাবাকে ফোন করে হাসপাতালে আসতে বলেন এবং চিকিৎসকেরা ফাহমিদাকে মৃত ঘোষণা করলে তিনি লাশ রেখে পালিয়ে যান। সিফাত আত্মহত্যার দাবি করলেও ফাহমিদার মা তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। সিফাত দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর আগাম জামিনের আবেদন নাকচ হলে গ্রেপ্তার হন এবং দেড় মাস কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্তি পান। ফাহমিদার চার সন্তান এখন নানা-নানির কাছে আছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম প্রথম আলোকে বলেন, পারিবারিক সহিংসতাকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার একটি সংস্কৃতি সমাজে রয়েছে, যা এই অপরাধকে গ্রহণযোগ্যতার পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং পারিবারিক সহিংসতা (সুরক্ষা ও প্রতিরোধ) আইনের আওতায় ভুক্তভোগীরা বিচার চাইতে পারেন, কিন্তু নারী নির্যাতনের মামলার বিরুদ্ধে ‘৯৯ শতাংশই ভুয়া’ এমন অপপ্রচার বন্ধ করে ভুক্তভোগীদের বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে পরিবারগুলো বিচার চাইতে আগ্রহী হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত আট মাসে পারিবারিক সহিংসতার ২৮৪টি খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে ১১৯টি ঘটনায় মামলা হয়েছে। এই সময়ে ১০৮ জন নারী স্বামীর হাতে নিহত হয়েছেন এবং ২২ জন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গত বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ১২ মাসে পারিবারিক সহিংসতার ৫৬০টি ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছিল, যার মধ্যে ২৪৮টি ঘটনায় মামলা হয়। স্বামীর হাতে ২১৭টি হত্যা ও ২৮টি নির্যাতনের ঘটনা ছিল।
পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট ‘আমরাই পারি’ (উই ক্যান)-এর প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক প্রথম আলোকে বলেন, পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা কখনোই কম নয় এবং এটি প্রতিরোধে যেভাবে কাজ করা উচিত, সেভাবে হচ্ছে না। তিনি মনে করেন, শুধু আইন পরিবর্তন বা সংস্কারের মাধ্যমে এ ধরনের নির্যাতন প্রতিরোধ হবে না, বরং মাঠে গিয়ে মানুষকে বোঝাতে হবে যে নারীর প্রতি তাদের আচরণগত পরিবর্তন দরকার। বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা কাটাতে রাষ্ট্রকে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতি নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে, কারণ বিচারের হার কম হওয়ায় অপরাধীরা সাহসী হয়ে উঠছে। মাইদার মৃত্যুর দুই দিন পেরিয়ে গেলেও তার মায়ের আহাজারি থামছে না। তিনি বলেন, ‘মেয়েটার বয়স যখন তিন বছর, তখন ওর বাবা মারা গেছে। অনেক কষ্ট করে ওদের মানুষ করছি। আমার মেয়েটারে শ্বাসরোধ করে মারছে। আপনারা দেইখেন, ওর (সিয়াম) যেন ফাঁসি হয়।’
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ১২ মাসে পারিবারিক সহিংসতার ৫৬০টি ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছিল।

















