কুমিল্লার ১৩ বছর বয়সী কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে অভিভাবকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অনেকেই নিজেদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন এবং সমাধানের পথ খুঁজছেন। এমনই এক পোস্টে ইকবাল আহমেদ নামের একজন বাবা প্রশ্ন তুলেছেন, বাইকের মতো শিশুদের শরীরে বা হাতঘড়িতে জিপিএস ট্র্যাকার লাগানো যায় কিনা। তাঁর এই পোস্টে অর্ধশতাধিক অভিভাবক একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন এবং কেউ পরামর্শ চেয়েছেন, কেউবা দিয়েছেন।
গত শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ির বাসা থেকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে মায়ের আইফোন নিয়ে বের হয়েছিল অপ্রতিম। সে আর বাসায় ফেরেনি। পরদিন শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। অপ্রতিম ছিল কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার কোটবাড়ি এলাকার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার মা নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার মোবাইল অ্যাকসেসরিজের ব্যবসা করেন।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান গত রোববার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই অপ্রতিমকে পরিকল্পিতভাবে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে বাধা দিলে বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয় এবং মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর আসামিরা আইফোনটি নিয়ে পালিয়ে যায়। এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আইফোন ছিনতাইয়ের পাশাপাশি ৫ হাজার টাকার পাওনা এবং ‘অসম বন্ধুত্ব’ কাজ করেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। অপ্রতিমের বাবার করা হত্যা মামলায় সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা পুলিশ। তুহিন ছাড়া অন্য দুজন কিশোর। পুলিশ এই তিনজনের বাইরে আরও এক তরুণের সম্পৃক্ততা যাচাই করছে। তুহিনের বাসা থেকে অপ্রতিমের আইফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও জানিয়েছেন, অপ্রতিম হত্যায় জড়িতরা অনেকটা কিশোর অপরাধীর মতো এবং ১২ ঘণ্টার মধ্যে সবাইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে তার মা-বাবাকে দোষারোপ করছেন। তাদের প্রশ্ন, অপ্রতিম তার চেয়ে বয়সে বড়দের সঙ্গে মিশত, মোটরসাইকেল চালাত, টিকটকে ভিডিও আপলোড করত এবং ‘কিশোর গ্যাং’–এর সদস্যদের সঙ্গে তার চলাচলের অভিযোগ ছিল—এসব বিষয় কেন মা-বাবা জানতেন না? তবে এই অভিযোগের বিপরীতে প্রশ্ন উঠেছে, নিখোঁজ থাকা বা নিখোঁজের পর মরদেহ উদ্ধার হওয়া অন্যান্য শিশুদের বেলায় কী বলবেন অভিযোগকারীরা, যাদের কাছে কোনো দামি জিনিস ছিল না?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ফাতেমা রেজিনা ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, শিশুরা নানাভাবে হত্যার শিকার হচ্ছে—প্রতিবেশীদের মাধ্যমে, পরিচিত–অপরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে। পরিবার কতখানি নিরাপত্তা দিতে পারে, সেই প্রশ্নও আসে। পরিবারের ওপর দায়িত্ব চাপালে কিংবা ঘটনা ঘটার পর পরিবারের ওপর দায় চাপালে চলবে না। তিনি আরও বলেন, একক ও ছোট পরিবারের পক্ষে শিশুকে সারাক্ষণ দেখে রাখা সম্ভব নাও হতে পারে, আর কিশোর বয়সীরা খবরদারি মেনেও নেয় না। কীভাবে শিশুর জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলা যায়, সেটা নিয়ে সবাইকে ভাবতে হবে এবং শিশুকে বিপদ সম্পর্কে শেখাতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ মনে করেন, রাজনৈতিক বিদ্বেষ, পারিবারিক সংঘাত, পূর্বশত্রুতাসহ বিভিন্ন কারণে রাগ, ক্ষোভ, প্রতিশোধ থেকেও শিশুহত্যার ঘটনা ঘটছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এককেন্দ্রিক দায় চাপিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতা এড়ানোর সুযোগ নেই। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং দায়ী ব্যক্তিদের উপযুক্ত সাজা নিশ্চিত না হওয়ায় শিশুহত্যার ঘটনা বাড়ছে। তার মতে, শিশু নিখোঁজ হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশের প্রস্তুতি থাকা দরকার এবং অপরাধে কিশোরেরা জড়িত থাকলে ‘পিয়ার প্রেশার বা ইনফ্লুয়েন্স’ খতিয়ে দেখা দরকার।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে দেশে শিশু নিখোঁজের ১৫ হাজার ৭১৭টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে, তবে এখনো ২ হাজার ৩৮ শিশু নিখোঁজ রয়েছে। উদ্ধার হওয়া শিশুদের সবাই জীবিত নাকি অপ্রতিমের মতো কারও কারও মরদেহ পাওয়া গেছে, সে তথ্য স্পষ্ট করে বলা হয়নি। অন্যদিকে, মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসে ৩৬ নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
অপ্রতিমের ক্ষেত্রে আইফোন ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্য থাকলেও, অনেক শিশুর নিখোঁজ বা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় কোনো দামি জিনিসের সংশ্লিষ্টতা থাকে না। যেমন, গত ১০ সেপ্টেম্বর জামালপুরের মাদারগঞ্জে সাত বছরের এক শিশু বিদ্যালয়ে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেনি। দুই দিন পর ১২ সেপ্টেম্বর সহপাঠীর বাড়ির মেঝেতে মাটিচাপা অবস্থায় তার মরদেহ পাওয়া যায়। পুলিশ জানায়, সহপাঠীর বাবা শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছেন। ৯ সেপ্টেম্বর পাবনা সদরে ১০ বছরের এক শিশু নিখোঁজ হয় এবং ১৬ সেপ্টেম্বর স্থানীয় একটি ডোবা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। রাজধানীর মিরপুরের শিশু ইব্রাহিম প্রায় চার মাস ধরে নিখোঁজ। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুদের কারও কাছেই দামি কোনো জিনিস ছিল না।
ইকবাল আহমেদ তার পোস্টে আরও লেখেন, “আমি চাই নিরাপত্তা থাকুক। সরকার যেন সেটা নিশ্চিত করে। মা–বাবা খেয়াল রাখবে, মা–বাবা দায়িত্ব নেবে, এটা বললে তো হবে না।” একজন নারী অভিভাবক তার ১১ বছর বয়সী ছেলের সাইকেল চালানো ও বন্ধুদের সঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতা জানিয়ে লেখেন, তিনি ছেলের বন্ধুদের অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, কিন্তু তবুও অস্থিরতা কাটে না। তিনি বর্তমান পরিস্থিতি দেখে খুবই অস্থির বোধ করছেন।

















