জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির জেরে সরকারিভাবে নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশের আগেই ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন রুটে বাসে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। সর্বনিম্ন ১০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১৫ টাকা। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর শনির আখড়া, আসাদগেট, ফার্মগেট ও বাংলামোটরসহ বিভিন্ন রুট ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। বাসে ওঠার সময়ই চালকের সহকারীরা যাত্রীদের সতর্ক করে বলছেন, ‘আজকে কিন্তু ভাড়া বেশি।’ বাড়তি ভাড়া দিতে রাজি না হওয়ায় কোথাও কোথাও যাত্রীদের সঙ্গে তাঁদের কথা–কাটাকাটিও হচ্ছে। নতুন ভাড়ার তালিকা না থাকায় কত ভাড়া দিতে হবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়, আর বাড়তি ভাড়া গুনতে গিয়ে ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন অনেক যাত্রী।
রাজধানীর বিভিন্ন রুটে ভাড়ার তারতম্য লক্ষ্য করা গেছে। মৌমিতা পরিবহনের একটি বাসে শনির আখড়া থেকে চানখাঁরপুলের ভাড়া আগে ২০ টাকা থাকলেও আজ ২৫ টাকা নেওয়া হচ্ছে, এবং নীলক্ষেতের ভাড়া ২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এই দুটি স্থানের ভাড়া আগে ১০ টাকা নেওয়া হলেও আজ ১৫ টাকা আদায় করা হচ্ছে। এছাড়া, আসাদগেট থেকে ফার্মগেট ও ফার্মগেট থেকে শাহবাগ পর্যন্ত আগে ১০ টাকা ভাড়া নেওয়া হলেও আজ ১৫ টাকা নিতে দেখা গেছে।
মৌমিতা পরিবহনের সহকারী সাদ্দাম হোসেন প্রথম আলোকে জানান, সরকার কিছু না জানিয়েই হুট করে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই আজ সকাল থেকে তাঁরা যাত্রীদের তেলের দাম বাড়ার কথা জানিয়ে প্রতি স্টপেজে পাঁচ টাকা বেশি নিচ্ছেন। তবে সব যাত্রীর কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় করতে পারছেন না বলে তিনি স্বীকার করেন।
তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও অতিরিক্ত ভাড়া দেওয়া জনগণের জন্য বাড়তি ভোগান্তি উল্লেখ করে বেসরকারি চাকরিজীবী কে এম আল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, তেলের দাম বাড়বে, সেটি সরকার আগে থেকে জানিয়ে দিলে ভালো হতো। হুট করে তেলের দাম বাড়ানোয় বাসের প্রতি স্টপেজে বাড়তি পাঁচ টাকা নিচ্ছে। বাসা থেকে ২০ টাকা ভাড়া দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বের হলেও বাসে উঠে ২৫ টাকা দিতে হচ্ছে, যা জনগণের জন্য দুর্ভোগ তৈরি করেছে। আসাদগেট থেকে ফার্মগেট যাওয়ার জন্য এই প্রতিবেদক গাবতলী সার্ভিস (প্রা.) লিমিটেডের একটি বাসে ওঠেন, যেখানে আগে ১০ টাকা ভাড়া থাকলেও আজ ১৫ টাকা নেওয়া হয়। ফার্মগেট থেকে বিহঙ্গ পরিবহনের বাসে শাহবাগ যাওয়ার পথেও একই চিত্র দেখা যায়।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মনির হোসেন বিহঙ্গ পরিবহনের ওই বাসে ফার্মগেট থেকে গুলিস্তান যাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, “খালি ভোগান্তিই নয় ভাই, আমরা নিম্নমধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। আমাদের জন্য কষ্ট। আমরা তো গোনা টাকায় চলি। বাড়তি কোনো টাকা নেই। এক্সট্রা ইনকাম নেই। যে টাকা পাই, সে টাকা দিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হয়। নতুন করে গাড়িভাড়া যদি বৃদ্ধি হয়, সেটা আমাদের জন্য জুলুম।” তবে নতুন ভাড়া নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত অনেকে বাড়তি টাকা দিতে চান না। বিহঙ্গ পরিবহনের বাসটিতে থাকা ঠিকাদার আমিনুল ইসলাম রানা বলেন, “আমি এখন পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া দিইনি, দেবও না। যতক্ষণ তারা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে রেট নির্ধারণ করবে না, ততক্ষণ তাদের অতিরিক্ত ভাড়া দেব না।”
বেলা একটার দিকে ফার্মগেট এলাকায় বিভিন্ন বাসের চালকের সহকারী ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে ভাড়া আদায়ে ভিন্নতা দেখা যায়। কেউ বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন, কেউ নিচ্ছেন না। যাঁরা নিচ্ছেন না, তাঁরা নতুন ভাড়ার তালিকার অপেক্ষায় আছেন বলে জানিয়েছেন। আবার কেউ বাড়তি ভাড়া চাইলেও যাত্রীরা তা দিতে চাইছেন না। আবদুল্লাহপুর থেকে ফুলবাড়িয়া রুটে চলাচলকারী এয়ারপোর্ট–বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ পরিবহনের চালকের সহকারী রুবেল হোসেন বলেন, “দাম বাড়ানো হয় নাই। কিন্তু আমাদের তেলের যে অবস্থা, তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। যাত্রীদের থেকে চাই (অতিরিক্ত ভাড়া), কিন্তু যাত্রীরা ঠিকমতো দেয় না।”
ওয়েলকাম পরিবহন সাভার থেকে মতিঝিল রুটে চলাচল করে। বাসচালকের সহকারী সজীব মিয়া জানান, গতকাল সোমবার রাত থেকে তাঁরা বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন। তবে একই পরিবহনের আরেক বাসের সহকারী মতিন মিয়া উল্টো তথ্য দিয়ে বলেন, নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশ হলে তাঁরা বাড়তি ভাড়া নেবেন। শিকড় ও বিকল্প পরিবহনের সহকারীরা জানান, তাঁরা এখনো আগের ভাড়াই নিচ্ছেন। শনির আখড়া ও ফার্মগেট এলাকায় দুটি বিআরটিসি বাসের সহকারীরাও আগের ভাড়া নেওয়ার কথা জানান। যাত্রীরাও বলেন, এসব বাসে তাঁদের বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে না। এর আগে, বেলা পৌনে ১১টার দিকে শনির আখড়া বাস স্টপেজে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড, ভুলতা ও মাতুয়াইল থেকে আসা অন্তত সাতটি বাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। বাসগুলো গুলিস্তান পর্যন্ত চলাচল করে। এসব বাসের চালকেরা জানান, আগে এসব বাস ডিজেল–চালিত ছিল, তেলের দাম বাড়ার পর বেশ কিছুদিন আগে গ্যাসে রূপান্তর করা হয়েছে। তাই তাঁরা আগের ভাড়াই নিচ্ছেন। তবে সাইনবোর্ড থেকে সাভার রুটে চলাচলকারী লাব্বাইক পরিবহনে গতকাল সোমবার রাত থেকে বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। সাইনবোর্ড থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা রুটের অনাবিল পরিবহনেও একই হারে ভাড়া বেড়েছে। তবে ভুলতা থেকে গুলিস্তান রুটের মেঘলা পরিবহনে ভাড়া বাড়েনি।
ঢাকায় চলা বেশির ভাগ বাস–মিনিবাস বাইরে থেকে দেখতে রংচটা ও লক্কড়ঝক্কড়। বেশির ভাগ বাসের পেছনের লাইট–ইন্ডিকেটর নেই, ডানে–বাঁয়ে বা পেছনে দেখার আয়না নেই। ভেতরে আসনও তেল চিটচিটে। দাঁড়িয়ে গাদাগাদি করে যেতে হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলতে দেওয়া হবে না বলে ঘোষণা দিলেও, তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকার পেরিয়ে এখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়, কিন্তু রাজধানীর বেশির ভাগ বাসেরই চেহারা বদলায়নি। পুরোনো লক্কড়ঝক্কড় এসব বাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়তি ভাড়ার চাপ। সরকারি সিদ্ধান্তের অপেক্ষা না করেই পরিবহনকর্মীদের অনেকেই নিজেদের মতো ভাড়া নিচ্ছেন, আর সেই বাড়তি টাকার বোঝা বইতে হচ্ছে যাত্রীদের।

















