সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত শেষ করতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্সকে আরও ছয় মাস সময় দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিভিন্ন সংস্থার অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত এই টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতার কথা এসেছে। এটি নিয়ে চতুর্থবারের মতো সময় পেল টাস্কফোর্স।
মঙ্গলবার বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরের বরাতে এমন তথ্যসংবলিত তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এই সময় মঞ্জুর করেন। পরবর্তী আদেশের জন্য ২০২৭ সালের ২৯ এপ্রিল তারিখ ধার্য করেছেন আদালত। সেদিন টাস্কফোর্স ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিষয়টির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আদালতে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।
এর আগে আদালতে দাখিল করা অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়, টাস্কফোর্সের সদস্যসহ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার সঙ্গে আলোচনাকালে তাঁরা প্রাথমিকভাবে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতা পেয়ে তদন্ত করে যাচাই-বাছাই করছেন বলে জানান। তাঁদের প্রাথমিক তদন্ত শেষ হলে প্রাপ্ত তথ্যাদি পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তাকে হস্তান্তর করবেন বলেও উল্লেখ করা হয়।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। সাগর সে সময় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মাছরাঙা টেলিভিশনে এবং রুনি এটিএন বাংলায় কর্মরত ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রুনির ভাই নওশের আলম বাদী হয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন।
আজ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল প্রতিবেদনের অংশবিশেষ তুলে ধরে শুনানি করেন। সঙ্গে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর মোহাম্মদ আজমী। বাদীপক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির এবং রিট আবেদনকারী পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।
পরে নিজ কার্যালয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, এই মামলার নতুন তদন্তভার গ্রহণ করে টাস্কফোর্স ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মোট ৯০ জন সাক্ষীকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে এবং ২৪ জনের জবানবন্দী রেকর্ড করেছে। তিনি আরও বলেন, আদালতের নির্দেশে গঠিত টাস্কফোর্সের কার্যক্রমে ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। গত ৩০ আগস্ট বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বক্তব্য দেন যে, দুদক এনটিএমসির সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসায় অভিযান চালায়। সেখানে বেশ কিছু ডিজিটাল আলামত পেয়ে দুদক সেগুলো জব্দ করে। সেগুলোর মধ্যে বিভিন্ন রকম জিও লোকেশন, এসএমএস, সিডিআরের প্রিন্টেড ভার্সন পাওয়া যায়।
অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, এ–সংক্রান্তে জিয়াউল আহসানের সহকারী একজন র্যাব সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদে উল্লিখিত প্রসিকিউটর প্রাথমিক তদন্তে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং একজন মিডিয়া ব্যক্তিত্বের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় বলে বর্ণনা দেন। জোহার বক্তব্য সমর্থন করে পরবর্তী সময়ে আইসিটি ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই ধরনের বক্তব্য প্রদান করেন। তাঁরা জানান, মিডিয়াতে তাঁদের তদন্তকাজ শেষ হলে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত তথ্য তাঁরা পিবিআইয়ের তদন্তকারী দলের কাছে হস্তান্তর করবেন। এর মধ্যে পিবিআই তদন্ত দল দুজন ব্যক্তি আইনজীবী ও প্রসিকিউটরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং তাঁদের কাছে কী আলামত আছে তা চেয়ে একটি চিঠিও দিয়েছেন বলে অ্যাটর্নি জেনারেল জানান। এই বিষয়টি তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. আজিজুল হক অগ্রগতি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন।
সময় চাওয়ার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস বলেন, আইসিটি তদন্তকারী প্রসিকিউশন টিম প্রায় ৩০০টি সিডি উদ্ধার করেছে, যা তারা সমস্তটা দেখতে পারেনি। সুতরাং তাদের তদন্ত সম্পন্ন করে কিংবা প্রাথমিক সন্তুষ্টি শেষে পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে দেওয়াটা সময়সাপেক্ষ হতে পারে। এ কারণে আদালতের কাছে সময় চাওয়া হয়েছিল।
বাদীপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির এক ব্রিফিংয়ে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সময় চাওয়া হয়েছে এই কথা বলে যে, তাঁদের কাছে আপডেট আছে। তাঁরা আজ আদালতে যে আপডেটের কথা বলেছেন, সেটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সংশ্লিষ্ট এবং সেখানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একজন প্রসিকিউটরের বরাত দিয়ে তাঁরা বলেছেন যে, তাঁরা কিছু ডেভেলপমেন্ট পেয়েছেন, কিছু সিডি পেয়েছেন এবং দুজন ব্যক্তির নাম বলেছেন। সে আলোকে এগুলো অ্যাসেস করতে তাঁদের ৩০০টা সিডির মধ্যে ৯০টা অ্যাসেস হয়েছে, আরও ২১০টা অ্যাসেসমেন্টের বাকি আছে, সেগুলো করতে তাঁরা সময় চেয়েছেন। তাঁরা এক বছর সময় চেয়েছিলেন। তবে আমরা বলেছিলাম যে, এই সিডিগুলো অ্যাসেস করতে এত সময় লাগার কথা নয়। যেহেতু এটি জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সবচাইতে বেশি ইম্পর্টেন্স এখানেই থাকা উচিত। এ জন্য অল্প সময় দেওয়া দরকার।
শিশির মনির আরও বলেন, আদালত বিবেচনা করে তাঁদের ছয় মাস সময় দিয়েছেন এবং ২০২৭ সালের এপ্রিল মাসের ২৯ তারিখে পরবর্তী আদেশের জন্য আসবে। তিনি জানান, একটি সিগনিফিকেন্ট ডেভেলপমেন্ট আছে, সেটি বলেছেন যে টাস্কফোর্সের প্রধান এবং এই সিডিগুলো যাঁর সিডিতে আছে, অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটর এবং তদন্ত সংস্থার সদস্য, তাঁরা সবাই সেদিন আদালতের সামনে আসবেন। আদালতের সামনে এসে এই সিডি পর্যালোচনায় কী ডেভেলপমেন্ট পেলেন, তা আদালতকে অবহিত করবেন প্রোগ্রেস রিপোর্ট আকারে। প্রশ্নের জবাবে শিশির মনির বলেন, তাঁরা রিপোর্টে দুজনের নাম বলেছেন—মেজর জিয়াউল আহসান ও রোকেয়া প্রাচী। বললেই তো আর হবে না, এভিডেন্স সংগ্রহ করতে হবে। ওই এভিডেন্সটা সংগ্রহ করার জন্য তাঁরা সিডিগুলো পর্যালোচনা করতে চেয়েছেন। এই ৩০০টির ভেতরে তাঁরা ৯০টি অ্যাসেস করেছেন, বাকি ২১০টা অ্যাসেস করতে পারেননি। নির্ধারিত সময়ের ভেতরে অ্যাসেস করবেন এবং উপযুক্তভাবে, উপযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে উপযুক্ত যে এভিডেন্স পাবেন, এটা আদালতের সামনে উপস্থাপন করবেন—এটাই হবে তাঁদের প্রত্যাশা।

















