সম্প্রতি এক শিক্ষার্থীর করা একটি তীক্ষ্ণ প্রশ্ন আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। সে জানতে চেয়েছিল, যারা শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার কথা বলেন, তাদের মধ্যে কেউ যদি শিশুদের প্রতি যৌন নির্যাতনের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়েন, তবে তাদের অবস্থান কী হবে? ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কি অপরাধের বিচার বাধাগ্রস্ত হবে? গত কয়েক দিনে বাংলাদেশের কিছু ধর্মীয় ব্যক্তিকে ঘিরে শিশু ও শিক্ষার্থীদের চুম্বন করার মতো আচরণ গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, যা নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শিশুদের প্রতি স্নেহ প্রকাশের একটি সীমা থাকা উচিত এবং শিশুর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও সম্মতির বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া জরুরি। ধর্মীয় পরিচয় কাউকে এই বিচারের ঊর্ধ্বে রাখতে পারে না।
আমার শৈশবের স্মৃতিতে এমন কোনো ঘটনা নেই যেখানে কোনো শিক্ষক বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব শিশুদের চুম্বন করে আদর করেছেন। গঙ্গারামপুর প্রশন্ন কুমার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমার শিক্ষক মৌলানা মহিউদ্দিন সাহেব এবং নহাটা ফাজিল মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মৌলানা শাহ সুফি বজলুর রহমান সাহেবের কথা আজও মনে পড়ে। তাঁরা কেবল ধর্মীয় পোশাকেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং তাদের সততা, মানবিকতা ও ন্যায়ের মাধ্যমেই মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। তাঁরা কখনো শিশুদের চুম্বনের মাধ্যমে স্নেহ প্রকাশ করেছেন বলে আমার মনে পড়ে না, কিন্তু তাদের ব্যবহারে ছিল অসাধারণ আন্তরিকতা।
একবার আমাদের এলাকায় বড় ধরনের সংঘর্ষের উপক্রম হলে মৌলানা মহিউদ্দিন সাহেব কেবল উপস্থিত হয়ে এবং শান্তির কথা বলেই শত শত অস্ত্রধারী মানুষকে থামিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি কোনো ভয় দেখিয়ে নয়, বরং দীর্ঘদিনের অর্জিত বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার মাধ্যমে মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। নহাটা মাদ্রাসার বার্ষিক ইসলামী ধর্মসভায় তাঁদের ওয়াজের মূল সুর ছিল নৈতিকতা ও কোরআন-হাদিসের শিক্ষা। তারা কখনো ঘৃণা ছড়াতেন না বা রাজনৈতিক বিদ্বেষ উসকে দিতেন না। তাদের জীবন ছিল সততার প্রতীক, যেখানে পারিশ্রমিক বা অর্থ সংগ্রহের কোনো স্থান ছিল না।
আজ যখন ধর্মীয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অনৈতিক আচরণের অভিযোগ ওঠে, তখন বড় হুজুর ও ধলা হুজুরের মতো আদর্শ শিক্ষকদের কথা বেশি মনে পড়ে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ধর্মীয় পরিচয় বা জনপ্রিয়তাকে গুরুত্ব না দিয়ে আইন অনুযায়ী বিচার হওয়া প্রয়োজন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের পক্ষের মানুষের জন্য নীরব থাকা আর প্রতিপক্ষের জন্য সোচ্চার হওয়া দ্বিচারিতা। ধর্ম কারো অপরাধ ঢাকার অজুহাত হতে পারে না। ধর্মীয় নেতৃত্ব কেবল বক্তব্যে নয়, বরং নিজের জীবন ও আচরণের মাধ্যমে নৈতিকতা প্রমাণ করেন।
একজন ধর্মীয় শিক্ষক যখন ঘৃণা বা সহিংসতা ছড়ান, তখন তিনি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের বিশ্বাস দুর্বল করেন। পক্ষান্তরে, প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষক মানুষকে সংযম ও শান্তির পথ দেখান। সমাজকে শান্ত রাখতে এমন মানুষেরই প্রয়োজন যারা ধর্মের শিক্ষাকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করবেন। পরিশেষে বলতে চাই, ধর্মের নামে বিদ্বেষ নয়, বরং মানুষের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও মানবিকতাই হোক আমাদের মূল শিক্ষা। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধীর পরিচয় নির্বিশেষে ন্যায়ের পক্ষে থাকা প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব।

















