আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) যখন তীব্র আর্থিক সংকটের মুখে পড়ে দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল, তখন কোনো বড় মাপের কোচকে নিয়োগ দেওয়ার সামর্থ্য তাদের ছিল না। নিরুপায় হয়ে এএফএ তৎকালীন সহকারী কোচ লিওনেল স্কালোনির কাঁধে দলের দায়িত্ব তুলে দেয়। ২০১৮ সালের ৩ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়, যা পরে ২৯ নভেম্বর স্থায়ী রূপ পায়। সে সময় স্কালোনিকে নিয়ে চারদিকে উপহাস ও সমালোচনা হয়েছিল। এমনকি দিয়েগো ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তিও মন্তব্য করেছিলেন যে, স্কালোনি ট্রাফিক পরিচালনা করারও যোগ্য নন, তবে ভাগ্য হয়তো অন্য কিছু লিখে রেখেছিল।
সেই সময় আর্জেন্টিনার ফুটবলে ছিল চরম বিষাদের সময়। ২৬ বছর ধরে কোনো বড় শিরোপার স্বাদ না পাওয়া দলটি ২০১৪ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালসহ ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজিত হয়ে অভিশপ্ত অবস্থায় ছিল। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পর লিওনেল মেসির অশ্রুসিক্ত চোখ দেখে ফুটবল বিশ্ব ধরে নিয়েছিল আর্জেন্টিনার দুঃখ চিরন্তন। ঠিক তখনই স্কালোনি ডাগআউটে এসে যেন আলাদিনের দৈত্যের মতো আর্জেন্টিনার ভাগ্য বদলে দেওয়ার দায়িত্ব নিলেন। কোটি ভক্তের একটাই চাওয়া ছিল—একটি ট্রফি এবং মেসির মুখে হাসি ফোটানো। স্কালোনি নিঃশব্দে কাজ শুরু করেন এবং তরুণদের মধ্যে বিশ্বাসের বীজ বুনে তৈরি করেন ‘লা স্কালোনেতা’।
২০১৯ সালের ২ জুলাই কোপা আমেরিকার সেমিফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হারের পর ব্যাপক সমালোচনা হলেও স্কালোনি দমে যাননি। ২০১৯ সালের ৩ জুলাই থেকে ২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর পর্যন্ত তাঁর দল টানা ৩৬টি ম্যাচ অপরাজিত থাকার অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়ে। ২০২১ সালের ১০ জুলাই মারাকানা স্টেডিয়ামে ব্রাজিলকে হারিয়ে ২৮ বছরের শিরোপা-খরা কাটান তিনি। এরপর ২০২২ সালের ১ জুন লন্ডনের ওয়েম্বলিতে ইতালিকে হারিয়ে জেতেন ফিনালিসিমা।
কাতার বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে ২-১ গোলে হেরে যাওয়ার পরও স্কালোনি ভেঙে পড়েননি। মেক্সিকো, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস ও ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে তিনি দলকে ফাইনালে তোলেন। শেষ পর্যন্ত ১৮ ডিসেম্বর ২০২২ সালে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচে ফ্রান্সের বিপক্ষে (৩-৩, টাইব্রেকারে ৪-২) জয়লাভ করে ৩৬ বছর পর আর্জেন্টিনাকে বিশ্বজয়ের সোনালি ট্রফি এনে দেন। সাফল্যের ক্ষুধা যে কমেনি, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই, যখন লাউতারো মার্টিনেজের গোলে কলম্বিয়াকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয়বারের মতো কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন হয়।
আজ আর্জেন্টিনার প্রতিটি ঘরে উৎসবের আমেজ। যে মেসি একসময় অভিমানে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন, আজ তিনি বিশ্বজয়ের তৃপ্ত হাসিতে ভাসছেন। এই সাফল্যের নেপথ্যে থাকা সেই সমালোচিত সহকারী কোচ আজ আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের রূপকথার জাদুকর। ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চেও স্কালোনির অধীনে ‘লা স্কালোনেতা’ একই দৃঢ়তা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। শেষ চারের লড়াইয়ে পৌঁছে যাওয়া দলটির ভক্তদের বিশ্বাস, যে মানুষটি ভাঙা দলকে বিশ্বসেরার আসনে বসিয়েছিলেন, তিনি আবারও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাবেন।
২০১৯ সালের ২ জুলাই, কোপা আমেরিকার সেমিফাইনালে ব্রাজিলের কাছে ২-০ গোলে হেরে বিদায় নেওয়ার পর সবাই যখন আবার সমালোচনায় মুখর, স্কালোনি তখন দলকে দিলেন এক অদম্য রূপ।
২০১৯ সালের ৩ জুলাই চিলির বিপক্ষে ২-১ গোলের জয় দিয়ে শুরু করে ২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ৫-০ গোলে হারানো পর্যন্ত টানা ৩৬টি ম্যাচ অপরাজিত থাকার এক অবিশ্বাস্য, মহাকাব্যিক রেকর্ড গড়ে তাঁর দল!যে দৈত্য একবার ডানা মেলেছে, তাকে থামায় সাধ্য কার?মারাকানার সেই ঐতিহাসিক রাত (১০ই জুলাই, ২০২১), যে ব্রাজিলের মাঠে আর্জেন্টিনা যুগের পর যুগ ভুগেছে, সেই মারাকানা স্টেডিয়ামে কোপা আমেরিকার ফাইনালে আনহেল দি মারিয়ার জাদুকরি গোলে ব্রাজিলকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে স্কালোনি আর্জেন্টিনার দীর্ঘ ২৮ বছরের শিরোপা-খরা কাটান।ফিনালিসিমা জয় (১ জুন, ২০২২), লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে ইউরোজয়ী শক্তিশালী ইতালিকে ৩-০ গোলে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে স্কালোনি জানান দিলেন, তাঁর দল বিশ্বজয়ের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।.লুসাইল স্টেডিয়ামের জাদুকরি রাত (১৮ ডিসেম্বর, ২০২২), কাতার বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ২২ নভেম্বর ২০২২ তারিখে সৌদি আরবের কাছে ২-১ গোলের অবিশ্বাস্য ধাক্কা খেয়ে যখন পুরো বিশ্ব আর্জেন্টিনাকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল, স্কালোনি তখন ভেঙে পড়েননি।প্রদীপের দৈত্যের মতো তিনি মেক্সিকোকে (২-০), পোল্যান্ডকে (২-০), অস্ট্রেলিয়াকে (২-১), নেদারল্যান্ডসকে (টাইব্রেকারে জয়) এবং সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়াকে (৩-০) হারিয়ে দলকে ফাইনালে তোলেন।

















