ক্যানসারের সন্দেহ হলে রক্তে বিশেষ কিছু পরীক্ষা করা হয়, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে টিউমার মার্কার নামে পরিচিত। যেমন—স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে CA 15-3, কোলন ও রেকটাল ক্যানসারে CEA, প্যানক্রিয়াসের জন্য CA 19-9, লিভার ক্যানসারের ক্ষেত্রে AFP, জরায়ু ক্যানসারে CA-125 এবং প্রোস্টেট ক্যানসারের জন্য PSA পরীক্ষা করা হয়। অনেকে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবে এসব পরীক্ষা করিয়ে থাকেন। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এই রক্ত পরীক্ষাগুলো দিয়ে কি নিশ্চিতভাবে ক্যানসার শনাক্ত করা সম্ভব?
বাস্তবিক প্রেক্ষাপটে, টিউমার মার্কারের মাত্রা বেড়ে গেলেই যে ক্যানসার হয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। আবার মাত্রা স্বাভাবিক থাকলেই ক্যানসার নেই, এমনটিও ভাবার অবকাশ নেই। মূলত এগুলো ক্যানসার নির্ণয়ের চূড়ান্ত কোনো পরীক্ষা নয়, বরং এগুলো নির্ণয়ে সহায়তাকারী পরীক্ষা হিসেবে কাজ করে।
টিউমার মার্কার হলো শরীরে উৎপন্ন কিছু নির্দিষ্ট প্রোটিন, হরমোন, অ্যান্টিজেন বা এনজাইম জাতীয় পদার্থ। ক্যানসার কোষ যেমন এগুলো তৈরি করতে পারে, তেমনি ক্যানসারের প্রতিক্রিয়ায় শরীরও নিজে এগুলো উৎপাদন করে। অধিকাংশ টিউমার মার্কারের সেনসিটিভিটি ও স্পেসিফিসিটি শতভাগ নয়। সেনসিটিভিটি দিয়ে বোঝায় পরীক্ষাটি ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের কতজনকে শনাক্ত করতে পারে, আর স্পেসিফিসিটি দিয়ে বোঝায় ক্যানসারবিহীন মানুষকে কতটা সঠিকভাবে স্বাভাবিক দেখাতে পারে।
বিভিন্ন মার্কারের কার্যকারিতা ভিন্ন। স্তন ক্যানসারে CA 15-3 মূলত মেটাস্ট্যাটিক রোগের পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত হয়। চিকিৎসার পর এর মাত্রা কমলে ভালো প্রতিক্রিয়ার ধারণা পাওয়া গেলেও প্রাথমিক স্তন ক্যানসার শনাক্তে এটি উপযুক্ত নয়। কোলোরেক্টাল ক্যানসারে CEA পরীক্ষার মাধ্যমে অস্ত্রোপচারের পর ফলোআপ করা হয়, তবে ধূমপান বা লিভারের প্রদাহেও এর মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। প্যানক্রিয়াস ও পিত্তনালির ক্যানসারে CA 19-9 ব্যবহৃত হয়, কিন্তু জন্ডিস বা প্যানক্রিয়াটাইটিসেও এর মাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই শুধু এই মার্কার দিয়ে ক্যানসার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
একইভাবে লিভার ক্যানসারে AFP সহায়ক হলেও এটি হেপাটাইটিস বা গর্ভাবস্থাতেও বাড়তে পারে। আবার জরায়ু ক্যানসারের CA-125 বা প্রোস্টেটের PSA মার্কারগুলো এন্ডোমেট্রিওসিস বা প্রোস্টেট বড় হওয়ার মতো সাধারণ সমস্যায় বেড়ে যেতে পারে। তাই ক্যানসার নির্ণয়ের মূল ভিত্তি হিসেবে রোগীর ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা, ইমেজিং, বায়োপসি ও হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষার ওপরই গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই এক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।

















