রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলার প্রধান সড়ক পর্যন্ত সর্বত্রই এখন ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক ও অটোরিকশার আধিপত্য। সস্তা ভাড়া ও সহজলভ্যতার কারণে এগুলো নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের যাতায়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তবে এর আড়ালে একটি নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে চলা এই যানগুলোর চার্জিংয়ের জন্য জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়ছে চাপ। এর একটি বড় অংশ অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে চার্জ হওয়ায় সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় ট্রান্সফর্মারগুলো ওভারলোড হচ্ছে, ভোল্টেজের ওঠানামা বাড়ছে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক ও অটোরিকশার সংখ্যা ১৫ লাখ থেকে ৩০-৪০ লাখ পর্যন্ত হতে পারে। শুধু ঢাকাতেই এর আনুমানিক সংখ্যা পাঁচ লাখ থেকে ১০ লাখ। এসব যানবাহনের একটি বড় অংশেরই কোনো নিবন্ধন বা বৈধ অনুমোদন নেই। সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী ব্যাটারিচালিত তিনচাকা যানবাহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এদের আমদানি, সংযোজন ও ব্যবহার বন্ধ হয়নি, বরং নিয়ন্ত্রণের বাইরেই বাড়ছে।
একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা সম্পূর্ণ চার্জ দিতে গড়ে পাঁচ থেকে ১০ ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। প্রতিদিন ১৫ লাখ রিকশা চার্জ হলে বিদ্যুৎ খরচ হতে পারে ৭৫ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ ইউনিট। মাসে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২২ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৪৫ কোটি ইউনিট। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, শুধু ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জিংয়েই জাতীয় গ্রিড থেকে প্রতিদিন অন্তত ৭০০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে। কোনো কোনো হিসাবে এই চাহিদা দৈনিক ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত হতে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিদ্যুৎ ব্যবহারের একটি বড় অংশই অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে হচ্ছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর আটটি জোনে বৈধ চার্জিং স্টেশনের পাশাপাশি রয়েছে ৪৮ হাজারের বেশি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট ও প্রায় এক হাজার গ্যারেজ। সরকারি হিসাবে ঢাকায় অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন রয়েছে প্রায় তিন হাজার। অবৈধ এসব চার্জিং পয়েন্টে আবাসিক সংযোগ, মিটার বাইপাস অথবা সরাসরি ট্রান্সফর্মার থেকে হুকিং করে বিদ্যুৎ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে একদিকে বিদ্যুৎ চুরি বাড়ছে, অন্যদিকে বিতরণ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এ খাতে সরকার প্রতিবছর প্রায় চার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ই-রিকশার মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন বদলে গেছে। রাত ১২টার পরও বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট থাকছে, যা অস্বাভাবিক। সারাদিন চলার পর বিপুলসংখ্যক রিকশা রাতে একসঙ্গে চার্জে বসানো হয় এবং এর বড় অংশই অবৈধ সংযোগে চার্জ হচ্ছে। তিনি জানান, অননুমোদিত সংযোগ চিহ্নিত করে বিচ্ছিন্ন করার অভিযান চলছে, তবে অনেক ক্ষেত্রে অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বাধার মুখে পড়ছেন।
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) একজন নির্বাহী পরিচালক মো. রবিউল হাসান বলেন, বৈধ সংযোগ না থাকায় অনেকেই অবৈধভাবে বিদ্যুৎ নিয়ে রিকশা চার্জ করেন। এ কারণে কিছু বৈধ চার্জিং স্টেশনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তবে অবৈধ পয়েন্টের সংখ্যা অনেক বেশি। নিয়মিত অভিযান ও মামলা হলেও স্থায়ী সমাধানের জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। ডেসকোর এক কর্মকর্তা জানান, তাদের আওতায় বৈধ চার্জিং সংযোগের সংখ্যা কয়েক হাজার, যেখানে সীমিত পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়। কিন্তু অবৈধ চার্জিং পয়েন্টগুলোতে রাতভর বিপুলসংখ্যক ব্যাটারি চার্জ হওয়ায় স্থানীয় ট্রান্সফর্মার ওভারলোড হয়ে পড়ছে। ফলে ভোল্টেজ ফ্লাকচুয়েশন বাড়ছে এবং আশপাশের আবাসিক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সিপিডির এক গবেষকের মতে, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের চার্জিং এখন জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য এক ধরনের ‘অদৃশ্য বোঝা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনের তুলনায় রাতে বিদ্যুতের চাহিদা কমার কথা থাকলেও বিপুলসংখ্যক রিকশা একযোগে চার্জে বসায় সেই স্বাভাবিক প্রবণতা ব্যাহত হচ্ছে। এতে সিস্টেম লস বাড়ছে এবং বিতরণ কোম্পানিগুলোর ওপরও আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
মিরপুরের এক গ্যারেজ মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তার গ্যারেজে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫টি রিকশা চার্জ হয়। বৈধ সংযোগ নিতে বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়ায় অনেকেই আবাসিক লাইন কিংবা সরাসরি সংযোগ ব্যবহার করেন। প্রতি রিকশা চার্জ বাবদ ৭০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। একই বাস্তবতার কথা জানান রিকশাচালক মো. রফিকুল ইসলাম। তার ভাষায়, রিকশা চালিয়েই সংসার চলে এবং ব্যাটারি চার্জ না করলে রিকশা চালানো সম্ভব নয়। গ্যারেজে রাতে রিকশা রেখে সকালে নিয়ে বের হন তারা। বিদ্যুৎ চুরির বিষয়টি শুনলেও জীবিকার তাগিদে তাদের অনেকেরই বিকল্প নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার মূল কারণ শুধু ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা নয়, বরং পুরো খাতের নিয়ন্ত্রণহীনতা। যানবাহনের নিবন্ধন, চার্জিং স্টেশনের লাইসেন্স, পৃথক মিটারিং এবং নিরাপত্তা মানদণ্ড না থাকায় খাতটি কার্যত অনানুষ্ঠানিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কার্যকর প্রয়োগের ঘাটতিতে অবৈধ ব্যবসা বিস্তৃত হয়েছে। তাদের মতে, সমাধানের প্রথম ধাপ হতে পারে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর আওতায় এনে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা। পাশাপাশি চার্জিং স্টেশনগুলোকে লাইসেন্সের আওতায় এনে পৃথক মিটার বসাতে হবে। সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক চার্জিং স্টেশন স্থাপনে প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। এতে যানবাহনের নিবন্ধন, ফিটনেস, চালকের লাইসেন্স এবং চার্জিং অবকাঠামোর বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা। মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদও জানিয়েছেন, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তার মতে, দরিদ্র মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িত হওয়ায় এসব যানবাহনকে একেবারে নিষিদ্ধ করা সম্ভব নয়; তবে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলতে দেওয়াও যাবে না।
ব্যাটারিচালিত রিকশার বিদ্যুৎ ব্যবহার এখন আর শুধু পরিবহন খাতের সমস্যা নয়। এটি বিদ্যুৎ চুরি, রাজস্ব ক্ষতি, বিতরণ ব্যবস্থার ওপর চাপ এবং গ্রিডের স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি জাতীয় সমস্যা। তাই শুধু অভিযান চালিয়ে এর সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিবন্ধন থেকে চার্জিং স্টেশন পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে একটি বৈধ ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনা। গরিব মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত এই যানবাহনকে রাতারাতি বন্ধ না করে পরিকল্পিতভাবে বৈধতা, মিটারিং ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা গেলে একদিকে যেমন যাত্রী ও চালকদের স্বার্থ রক্ষা হবে, অন্যদিকে কমবে বিদ্যুৎ চুরি ও রাজস্ব ক্ষতি। নইলে সস্তা ও সহজলভ্য পরিবহনের আড়ালে ‘গরিবের টেসলা’ই জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য ক্রমেই বড় বোঝা হয়ে উঠতে পারে।

















