জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এর মাধ্যমে দীর্ঘ প্রায় চার দশক পর বিশ্ব সংস্থার সর্বোচ্চ নেতৃত্বের আসনে বসলো বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে তিনি এই দায়িত্বের শপথ নেন। বিদায়ী ৮০তম অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করে নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ড. খলিলুর রহমানের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন সদ্য বিদায়ী প্রেসিডেন্ট আনালেনা বেয়ারবক। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর এবার বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দেওয়ার গৌরব অর্জন করলেন ড. খলিলুর রহমান।
শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ড. খলিলুর রহমান বলেন, “আমি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করছি, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কার্যাবলি আমি সম্পূর্ণ বিশ্বস্ততা, বিচক্ষণতা ও সততার সঙ্গে পালন করব। জাতিসংঘের সনদ এবং সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্টের জন্য প্রণীত নৈতিক আচরণবিধি অনুসরণ করে জাতিসংঘের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আমি আমার দায়িত্ব পালন ও আচরণ পরিচালনা করব। আমার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের বাইরে কোনো সরকার বা অন্য কোনো পক্ষের কাছ থেকে কোনো নির্দেশনা চাইব না বা গ্রহণ করব না।”
এর আগে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের ৪১তম সাধারণ অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী। দীর্ঘ বিরতির পর গত ২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৯৯ ভোট পেয়ে জয়ী হন বাংলাদেশের প্রার্থী ড. খলিলুর রহমান। তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিস। তীব্র কূটনৈতিক প্রতিযোগিতার পর এই নির্বাচনে সামান্য ব্যবধানে জয় পায় বাংলাদেশ।
এই শীর্ষ পদের জন্য বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছিল বেশ আগে। ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদের জন্য প্রার্থিতা ঘোষণা করে ঢাকা। তবে চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি ড. খলিলুর রহমানকে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার পর জোরদার কূটনৈতিক প্রচার শুরু হয়। হাতে সময় অত্যন্ত কম থাকলেও বাংলাদেশের কূটনীতিকরা বিশ্বজুড়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। অন্যদিকে সাইপ্রাস ২০১৬ সাল থেকেই প্রার্থিতা ঘোষণা করে দীর্ঘ এক দশক ধরে প্রচারণা চালিয়ে আসছিল। স্বল্প সময়ের মধ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও বহুপক্ষীয় ফোরামে নিবিড় যোগাযোগের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয় বাংলাদেশ।
নতুন এই অধিবেশনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হতে যাচ্ছে আগামী ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক। বিশ্বনেতাদের এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের ভাষণের মধ্য দিয়ে বিতর্ক শুরু হবে, যেখানে অংশ নেবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জাতিসংঘের কার্যক্রমে ড. খলিলুর রহমানের রয়েছে দীর্ঘ ও গভীর অভিজ্ঞতা। সাবেক এই পেশাদার কূটনীতিক তার কর্মজীবনের একটি বড় অংশ কাটিয়েছেন জেনেভা ও নিউইয়র্কে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায়। ১৯৯১ সালে জেনেভায় জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলন (ইউএনসিটিএডি)-এর বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে বিশ্ব সংস্থায় তার পথচলা শুরু হয়। এরপর প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও জ্যেষ্ঠ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতিসংঘের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনার প্রধান লেখক হিসেবেও কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও কূটনৈতিক দক্ষতাই তাকে বিশ্বমঞ্চের এই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি অনন্য ও ঐতিহাসিক অর্জন।

















