প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮: ৫৪। দেশে চলমান তীব্র গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে ফার্নেস অয়েলের ওপর ঝুঁকছে সরকার। এর মাধ্যমে অতিরিক্ত ৪,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে প্রয়োজনীয় ফার্নেস অয়েলের সরবরাহ চেয়ে আবেদন জানিয়েছে। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই পদক্ষেপ রাষ্ট্রের আর্থিক বোঝা আরও বাড়িয়ে তুলবে।
দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন হ্রাস এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটে এলএনজি আমদানিতে বিঘ্ন ঘটায় সরকার ব্যয়বহুল জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২,৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে ১,০৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসায় সামগ্রিকভাবে দৈনিক ১,৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ভোলা নর্থ বা ইলিশার মতো নতুন খনিতে গ্যাস থাকলেও পাইপলাইনের অভাবে তা ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলস্বরূপ, গ্যাসভিত্তিক অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হচ্ছে এবং লোডশেডিং থেকে শিল্প ও সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে ফার্নেস অয়েলচালিত কুইক রেন্টাল ও আইপিপি কেন্দ্রগুলো সচল করা হচ্ছে।
সেপ্টেম্বর মাস থেকে তেলচালিত কেন্দ্র থেকে দৈনিক ৪,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্তের ফলে বিপিসির ওপর নতুন করে দুই লাখ ৪,১০০ টনের রেকর্ড চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। এই চাহিদা মেটাতে বিপিসি এক লাখ টন তেল আমদানির প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং স্থানীয় উৎস থেকে আরও ২৫ হাজার টন সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মতে, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সুবিধা হলো এগুলো দ্রুত চালু করা যায় এবং এর জন্য জটিল বন্দর অবকাঠামোর প্রয়োজন হয় না। এছাড়া বেসরকারি খাতের শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ থাকায় সরকারের ওপর তাৎক্ষণিক ডলারের চাপ কিছুটা কমছে।
তবে বিপিডিবি ও হাইড্রো-কার্বন ইউনিটের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফার্নেস অয়েল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন এক বড় অর্থনৈতিক ফাঁদ। দেশীয় গ্যাসে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ ৪ থেকে ৭ টাকা পড়লেও ফার্নেস অয়েলে তা শুধু জ্বালানি খরচই ২০ টাকার বেশি। পরিচালন ব্যয় ও ক্যাপাসিটি চার্জসহ মোট ব্যয় ২৫ থেকে ২৭ টাকা ৩৬ পয়সায় পৌঁছায়। গ্রাহক পর্যায়ে কম দামে বিদ্যুৎ বিক্রির ফলে সরকারকে বিপুল লোকসান গুনতে হচ্ছে, যা আইএমএফের শর্ত মেনে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুন মাসে ২,৫০০-২,৮০০ মেগাওয়াট উৎপাদন হলেও আগস্টে ৬৫টি ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্র থেকে রাতে ৩,৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। বেসরকারি উদ্যোক্তারা বছরে গড়ে ২২ থেকে ২৩ লাখ টন ফার্নেস অয়েল আমদানি করেন, যার ৭৫-৮০ শতাংশই তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আসে। গত তিন মাসে তারা প্রায় ছয় লাখ টন তেল আমদানি করেছেন।
আইইইএফএ-এর লিড অ্যানালিস্ট ড. শফিকুল আলম জানান, অক্টোবরের শেষে চাহিদা কমলে এ পরিস্থিতি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসা সম্ভব। তবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে অফশোর ও অনশোরে গ্যাস অনুসন্ধান, ভোলা অঞ্চলের গ্যাস গ্রিডে আনা এবং সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানো জরুরি। তিনি আগামী গ্রীষ্মের আগেই রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ প্রাপ্তি এবং ১,০০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।

















