টাঙ্গাইলের গোপালপুরের কাঠমিস্ত্রি পবিত্র চন্দ্রসহ ৩০ জন বাংলাদেশি তরুণ ভাগ্যের সন্ধানে রাশিয়ায় গিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তা ও শোকের মুখোমুখি। গত ১৪ অক্টোবর স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) জানায়, জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৭ মে তারা রাশিয়ায় যান। নির্মাণকাজে ভালো বেতনের আশায় প্রত্যেকে গড়ে ১০ লাখ টাকা খরচ করেন। স্ত্রীর গয়না বেচে পাওয়া ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং একটি বেসরকারি সংস্থা ও স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে সাড়ে ৯ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন পবিত্র। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল কেড়ে নিয়ে জোরপূর্বক সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। পবিত্রর ভগ্নিপতি তপন চন্দ্র সূত্রধর প্রথম আলোকে বলেন, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পরের কয়েক দিন তাঁর সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ ছিল। মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় প্রথম দিনেই ১৭ জন নিহত হন এবং পরবর্তীতে আরও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। নিহতদের মধ্যে পবিত্র চন্দ্রর মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর তার পরিবার ভেঙে পড়েছে। পবিত্রর ভগ্নিপতি তপন চন্দ্র সূত্রধর জানান, ২৯ মে পবিত্র শেষবার ফোন করে জানিয়েছিলেন যে তাদের জোর করে যুদ্ধে নেওয়া হচ্ছে এবং সেখানে মৃত্যুর আশঙ্কা ৯৫ শতাংশ। পরে ১৫ মে তিনি জানান, তাঁদের কাজে নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে পবিত্রর স্ত্রী মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছেন এবং পরিবারের ওপর ঋণের পাহাড় জমেছে। এখন অবশিষ্ট ৩ শতাংশ জমি বিক্রি করার চিন্তা করা হচ্ছে; কিন্তু তাতেও ঋণ শোধ হবে না। দুই সন্তানের মধ্যে মেয়ের বয়স ৯ বছর আর ছেলের ৫ বছর। পবিত্রসহ নিহত ১৮ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে সোহেল, মেহেদী হাসান, মো. আল মামুন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, নাজমুল আলম, ওয়াসিম আকরাম, আরিফ হোসেন, সাঈদ মোল্লা, তারিকুল ইসলাম মিন্টু, সাব্বির হোসেন, মফিজ, আরমান আলী, নজরুল ইসলাম, আমিনুর ইসলাম, কাজী রেজাউল করিম, মাইন উদ্দিন, রিপন হোসেন ও আরিফ হোসেন পাটোয়ারী রয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জের রবিন মীরসহ আরও অনেকেই একই প্রতারণার শিকার হয়েছেন। রবিনের ভাতিজা রাহাত চৌধুরী জানান, ১৭ মে একটি ভিডিওতে সেনা ক্যাম্পে চাচাকে দেখা গেলেও ২৯ মে তিনি শেষবার ফোন করে জানিয়েছিলেন যে তাদের গভীর জঙ্গলে নিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রাজন হোসেন ও আদনান হোসেন কোনোমতে দেশে ফিরতে পারলেও পলাশ শেখ ও আলী হাসান সোহেল আহত অবস্থায় রাশিয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
বর্তমানে গোপালগঞ্জের রনি শেখ, লালমনিরহাটের আল আমিন ইসলাম, গোপালগঞ্জের সৌরভ মোল্লা, মাদারীপুরের কামাল হোসেন, কিশোরগঞ্জের আবু হানিফ ও মাদারীপুরের হেলাল শেখ এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে লড়ছেন। এদের মধ্যে সৌরভ মোল্লার স্বজন তাসলিম সরদার জানান, সৌরভ যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনের তিন-চার কিলোমিটার ভেতরে বাংকারের মাটি খোঁড়ার কাজ করছেন। প্রতিনিয়ত মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা এই তরুণেরা পালিয়ে আসার চেষ্টা করেও সফল হতে পারছেন না। এই পুরো ঘটনায় জড়িত বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্য নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, সরকারি উদ্যোগে যেন তাদের প্রিয়জনদের ফিরিয়ে আনা হয় বা অন্তত সঠিক তথ্য জানানো হয়।

















