তৈরি পোশাকশিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্তৃক বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। এই তালিকায় দেশের শীর্ষস্থানীয় অনেক শিল্পপতির নামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যাদের ব্যবসায়ী মহলে ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে। তবে উদ্বেগজনকভাবে, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই এমন অনেক ব্যবসায়ীর নামও এই তালিকায় স্থান পেয়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা, সমালোচনা এবং উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
শেল্টেক্ গ্রুপ ও এনভয় লিগ্যাসি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর আহমেদ এবং তাঁর মা রাশিদা আহমেদের ব্যাংক হিসাবও এনবিআর জব্দ করেছে। এই দুজনের কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই। শেল্টেক্ গ্রুপ তৈরি পোশাক, বস্ত্র, সিরামিক, আবাসনসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা পরিচালনা করে। তানভীর আহমেদ একজন তরুণ ও ইতিবাচক ভাবমূর্তিসম্পন্ন ব্যবসায়ী। তাঁর বাবা এনভয় টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান কুতুবউদ্দিন আহমেদ ছিলেন বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা। যদিও কুতুবউদ্দিন আহমেদ ও তাঁর ছেলে তানভীর আহমেদ সাড়ে চার বছর আগে সালাম মুর্শেদীর এনভয় গ্রুপের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন, তবুও সালাম মুর্শেদীর এনভয় গ্রুপের সঙ্গে আগের সূত্র ধরে এনবিআর তানভীর আহমেদ ও তাঁর মায়ের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে। তানভীর আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, ‘যাচাই-বাছাই করে তালিকায় নাম দিলে হয়রানির ঘটনা ঘটত না। আমাদের মতো একটা প্রতিষ্ঠানের আজকের অবস্থানে আসতে ৪০ বছর সময় লেগেছে। অভিযোগ থাকলে আমাদের সঙ্গে কথা বলা যেত। আশা করি, দ্রুত যাচাই করে বিষয়টির সমাধান করা হবে।’
একইভাবে, এনভয় গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়েছে এবং সালাম মুর্শেদী, তাঁর স্ত্রী শারমিন সালাম এবং মেয়ে শেহরীন সালামের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পর সালাম মুর্শেদী গ্রেপ্তার হলে তাঁর দুই সন্তান শেহরীন সালাম ঐশী ও ইশমাম সালাম বর্তমানে ব্যবসা দেখাশোনা করছেন।
পোশাক খাতের আরেক শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের মোশাররফ হোসেন ও তাঁর সন্তানদেরও রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। তাঁদের ব্যাংক হিসাবও জব্দ করা হয়েছে। তুসুকা গ্রুপের একজন উদ্যোক্তা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলে সংসদ সদস্য থাকার সূত্র ধরে গ্রুপটির অন্য তিনজন উদ্যোক্তাসহ আটজনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে, যদিও এই তিন উদ্যোক্তা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। তাঁদের মধ্যে একজন তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি আরশাদ জামাল, যার ব্যবসায়ী মহলে ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে। পোশাকের বাইরে এই গ্রুপটি এয়ারলাইনস ব্যবসাতেও জড়িত।
এভাবে ঢালাওভাবে ব্যাংক হিসাব জব্দের বিষয়ে একাধিক ব্যবসায়ী জানান, সব সরকারের আমলেই পোশাকশ্রমিকদের মজুরি আন্দোলনে বাইরে থেকে ইন্ধনের অভিযোগ ওঠে, যা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের আমলে বেশি ছিল। তবে এবার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে দুই শতাধিক ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের ঘটনা নজিরবিহীন। তাঁরা মনে করেন, এভাবে ঢালাও পদক্ষেপ না নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হলে কারও আপত্তি থাকত না এবং ব্যবসায়ীদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার বিষয়টিও সামনে আসত না।
শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে তৈরি পোশাকশিল্পে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে অস্থিরতা চলছে। শ্রমিক আন্দোলনের মুখে সরকার গত রোববার মজুরি বোর্ড গঠন করে। শিল্পমালিকেরা গত সপ্তাহে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি শ্রমিকদের আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের কিছু মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেন। গত সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, পোশাকশিল্পের মালিকেরা যাঁরা আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, তাঁরাও অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে কাজ করেছেন এবং এর পেছনে কিছু শিল্পমালিক ও সাবেক সংসদ সদস্য এবং প্রতিমন্ত্রীও জড়িত আছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর গত সপ্তাহে এনবিআর দুই শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চায় এবং গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে প্রায় ১০০ ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দেয়। এনবিআরের আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট (আইটিআইআইইউ) ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) পৃথকভাবে এই তালিকা করেছে। আইটিআইআইইউর একটি তালিকায় দেখা যায়, ১১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬৭ জন ব্যবসায়ী। প্রতিষ্ঠানগুলো সাতটি শিল্প গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত। এই ৬৭ জন ব্যবসায়ীর মধ্যে ৬ জন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন, দুজন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের পদে ছিলেন। এই আটজনের স্ত্রী, ভাই ও ব্যবসায়ী অংশীদারদের নামও তালিকায় রয়েছে। এছাড়া একটি অংশ শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, ‘শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন থাকতে পারে। তবে ভালো করে তদন্ত করে প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিলে কারও কোনো আপত্তি থাকবে না। ঢালাওভাবে ব্যাংক হিসাব জব্দ ও তলবের মতো উদ্যোগে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কাও থাকে তাতে। সরকারের প্রতি আহ্বান, প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির মুখে না পড়েন।’
পোশাক খাতে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপ মণ্ডল গ্রুপের ২৮টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়েছে। গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল মমিন মণ্ডল, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল আলিম মণ্ডল, পরিচালক জোবায়ের মণ্ডল, আসাদুর রহমানসহ ১৯ জনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। আবদুল মমিন মণ্ডল সিরাজগঞ্জ-৫ আসন থেকে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে আত্মগোপনে আছেন।
চট্টগ্রামের ওয়েল গ্রুপের তিন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলবের পাশাপাশি গ্রুপটির চেয়ারম্যান আবদুস সালাম, পরিচালক সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম, সৈয়দ শহীদুল ইসলাম, সৈয়দ তারিকুল ইসলামসহ ১১ জনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। আবদুস সালাম চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন এবং দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর ভাই সৈয়দ নুরুল ইসলাম আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের উপদেষ্টা ছিলেন এবং বর্তমানে কারাবন্দী। ওয়েল গ্রুপের তৈরি পোশাক, বস্ত্র ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ব্যবসা রয়েছে।
গিভেন্সি গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলব ও গ্রুপের চেয়ারম্যান খতিব আবদুল জাহিদসহ চারজনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। আবদুল জাহিদ আওয়ামী লীগের কোনো পদে ছিলেন কি না, তা বিজিএমইএ নেতারাও জানেন না। উত্তারার নিপা গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলব ও গ্রুপের চেয়ারম্যান খসরু চৌধুরীসহ চারজনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। খসরু চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং ২০২৪ সালে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আত্মগোপনে আছেন। এছাড়া বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাধারণ সম্পাদক এস এম আবদুল মান্নান ও তাঁর পরিবারের সদস্য ফরিদা মান্নানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে এনবিআর। মিরপুরের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা ও তাঁর পরিবারের সদস্য ফরিদা ইলিয়াসের ব্যাংক হিসাবও জব্দ করা হয়েছে।
আশির দশকে যাত্রা শুরু করা স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক শিল্প গ্রুপ। গ্রুপটির তিনটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব তলব এবং গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা এ কে এম মোশাররফ হোসেন ও আতিকুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হাসনাত মোশাররফসহ আটজনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের এমডি হাসনাত মোশাররফ বলেন, ‘এনবিআর খুবই অন্যায্যভাবে আমাদের নাম তালিকায় দিয়েছে। আমরা কখনোই কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। অন্য অনেক কারখানার পাশাপাশি আমাদের কারখানার শ্রমিকেরাও আন্দোলনে নেমেছে। তার মানে এই নয় যে আমরা শ্রমিকদের ইন্ধন দিয়ে রাস্তায় নামিয়েছি। এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ফয়জুর রহমান ব্যবসায়িক অংশীদার হওয়ায় তুসুকা গ্রুপও বিপদে পড়েছে। গ্রুপের ১০টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলব এবং পরিচালক ফয়জুর রহমান, আরশাদ জামাল, রেফায়েত উল্লাহ, ফিরোজ আলমসহ নয়জনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ফয়জুর রহমান গ্রেপ্তার হন। তুসুকা গ্রুপের একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত বৃহস্পতিবার ব্যাংকের মাধ্যমে কর্মীদের বেতন স্থানান্তর করা হয়েছে, তবে একটি অংশ বেতন পাননি কারণ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। কারখানায় ২০–২৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন এবং একদিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে এক থেকে দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়। তিনি আরও বলেন, গ্রুপের চার উদ্যোক্তার একজন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, অন্য তিনজন কখনো রাজনীতি করেননি। তাঁদেরও ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘যেকোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো চূড়ান্ত অভিযোগ আনার আগে ভালোভাবে তদন্ত করা উচিত। এরপরই ব্যবস্থা নেওয়া যুক্তিযুক্ত। আমরা এখনো পুরো তালিকা পাইনি। এরপরও আমরা বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চমহলে যোগাযোগ করব।’
গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫৬ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে তারা।

















