কর্পোরেট দুনিয়ায় একটি প্রচলিত ধারণা বেশ প্রতিষ্ঠিত—প্রতিষ্ঠান যখন কর্মী ছাঁটাই করে, তখন তা ‘ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত’ হিসেবে গণ্য হয়। অথচ একজন কর্মী যখন ভালো সুযোগ পেয়ে চাকরি ছাড়েন, তখন তাকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দেখা হয়। এই অদ্ভুত প্রেমের ব্যাকরণ বুঝতে হলে কর্পোরেট জীবনের অভিজ্ঞতা থাকা জরুরি, কারণ এখানে প্রতিষ্ঠানের সব সিদ্ধান্তই ব্যবসায়িক, আর কর্মীর সব সিদ্ধান্তই ব্যক্তিগত।
দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন কর্মীর কথা ভাবুন, যিনি সকাল নয়টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত কাজ করেন, ছুটির দিনেও ফোন ধরেন এবং অসুস্থ শরীর নিয়েও মিটিংয়ে অংশ নেন। এমনকি অফিসের ল্যাপটপের সঙ্গে তার সম্পর্ক এতটাই গভীর যে, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলেও ইমেইলের রিপ্লাই দেওয়ার কথা মনে পড়ে। কিন্তু বাজার খারাপ বা খরচ কমানোর অজুহাতে কোম্পানি যখন তাকে ছাঁটাই করে, তখন এইচআর বিভাগ অত্যন্ত মিষ্টি ভাষায় বলে, এটি একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত।
বিপরীত দিকে, কর্মী যখন বেতন বৃদ্ধি বা উন্নত পরিবেশের জন্য নতুন চাকরির সুযোগ পান, তখন পুরোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আবেগের দোহাই দেওয়া হয়। বস প্রশ্ন করেন, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কি কোনো ইমোশনাল কানেকশন নেই? অথচ বেতন বাড়ানোর আবেদন যখন তিনবার প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল, তখন সেই আবেগের কোনো মূল্য দেওয়া হয়নি। এমনকি দায়িত্বের তুলনায় অতিরিক্ত কাজের জন্য কোনো ওভারটাইম বিলও পরিশোধ করা হয়নি।
মজার বিষয় হলো, কোম্পানি যখন ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন বাজেট নেই বলে অজুহাত দেয়। কিন্তু কর্মী যখন পদত্যাগপত্র জমা দেন, তখন হঠাৎ করেই কোম্পানির বাজেটে আবেগের বরাদ্দ বেড়ে যায়। কোম্পানি তখন সম্পর্কের দোহাই দিয়ে কর্মীকে আটকে রাখার চেষ্টা করে। আসলে এই সম্পর্কটি দীর্ঘ সময় ধরে একতরফাভাবে চলছিল, যেখানে কোম্পানি কর্মী থেকে সময়, শ্রম ও মেধা নিয়েছে আর বিনিময়ে দিয়েছে কেবল বেতন ও ‘এক্সিলেন্ট টিম প্লেয়ার’ সার্টিফিকেট। বাড়িওয়ালাকে ভাড়া দেওয়ার সময় এই সার্টিফিকেট কোনো কাজে আসে না।
কর্পোরেট জগতে আনুগত্যের সংজ্ঞাও বেশ অদ্ভুত। আপনি যত দিন কম বেতনে বেশি কাজ করবেন, তত দিন আপনি বিশ্বস্ত। কিন্তু নিজের উন্নতির জন্য সিদ্ধান্ত নিলেই আপনি সুযোগসন্ধানী। কোম্পানি নিজের স্বার্থ দেখলে তা স্ট্র্যাটেজি, আর কর্মী দেখলে তা চরিত্রের সমস্যা। তবে সব প্রতিষ্ঠান এমন নয়; অনেক প্রতিষ্ঠানই কর্মীর অবদানকে সম্মান করে। কিন্তু যেখানে কর্মীকে সম্পদ না ভেবে খরচের খাত মনে করা হয়, সেখানে আনুগত্যের বক্তৃতা সবচেয়ে বেশি শোনা যায়।
চাকরি কোনো বিয়ে নয়, তাই পেশাদার আচরণ বজায় রেখে নিজের উন্নতির দরজা বন্ধ রাখা উচিত নয়। ভালো সম্পর্ক এবং পারস্পরিক সম্মানই সবকিছুর ভিত্তি হওয়া উচিত। মনে রাখবেন, কোম্পানি যখন আপনাকে ছাঁটাই করে, তখন তারা তাদের ভবিষ্যৎ বাঁচায়। আর আপনি যখন সুযোগ বুঝে চাকরি ছাড়েন, তখন আপনি নিজের ভবিষ্যৎ বাঁচান। কোম্পানির কাছে আপনি সম্পদ হিসেবে থাকা পর্যন্তই ট্যালেন্ট, যেদিন নিজের মূল্য বুঝে অন্য কোথাও যাবেন, সেদিনই আপনি তাদের গল্পের ভিলেন।

















