প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫: ৪৬। দেশের বৃহত্তম ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ ও নিয়মিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, এমডির পদ শূন্য হওয়ার তিন মাসের মধ্যে তা পূরণ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, তিন মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও ব্যাংকটি ভারপ্রাপ্ত এমডির ওপর ভর করে চলছে। দুই পক্ষের দ্বন্দ্বে নিয়োগ প্রক্রিয়া আটকে থাকায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যাহত হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে গ্রাহকদের ওপর।
ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. জহির হোসেন। তবে তিনি জানিয়েছেন, পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ ছাড়া বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। এর ফলে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত এমডিসহ আটজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদনও ঝুলে আছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর অতিরিক্ত এমডি মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন মজুমদার এবং ৯ সেপ্টেম্বর উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব আলম ও সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট আমিনুর রহমানের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। সরকারি চাকরিবিধি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত চাকরির বয়সসীমা ৬০ বছর পর্যন্ত। আর ৬৫ বছর পর্যন্ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত থাকতে পারে। এস আলম গ্রুপের সময়কার নিয়মের কারণে এসব শীর্ষ কর্মকর্তার নিয়োগ এখন পর্ষদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
গত ২৪ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে গ্রাহক বিক্ষোভ ও তীব্র তারল্য সংকটের মুখে সংকট সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ১৭ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেওয়ার পরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় শেষ পর্যন্ত গত ১৪ জুন ব্যাংকটির পুরো পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে দেয় এবং জহির হোসেনকে দায়িত্ব অর্পণ করে। এর আগে ১৩ এপ্রিল তৎকালীন এমডি ওমর ফারুক খানকে ছুটিতে পাঠানো হয়েছিল, যিনি পরে পদত্যাগ করেন। এরপর থেকেই ব্যাংকটিতে নিয়মিত এমডির পদ শূন্য রয়েছে।
ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াতে নানা ধরনের পরিকল্পনা হাতে নেয়। যেসব পরিকল্পনা শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বাস্তবায়ন শুরু করে। এতে ব্যাংকটি অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়। ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। প্রথম ছয় মাসে পরিচালন লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৮৫ কোটি টাকায় এবং খেলাপি ঋণ বেড়ে ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের ৫২ শতাংশ। আমানত ১ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা থেকে কমে ১ লাখ ৬১ হাজার কোটিতে নেমেছে। করপোরেট গ্রাহকরাও এলসি খোলা ও চলতি মূলধন সহায়তা পেতে হিমশিম খাচ্ছেন, যা পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন খাতের সাপ্লাই চেইনকে ঝুঁকিতে ফেলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানান, প্রশাসক নিয়োগের চেয়ে পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ গঠনের জন্য যোগ্য লোক খোঁজা হচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, শীর্ষ নেতৃত্বের দীর্ঘস্থায়ী শূন্যতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি ব্যাংকের ওপর গ্রাহকদের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক হতে পারে।

















