ইসরাইলের আসন্ন ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার ক্ষেত্রে আরব রাজনীতিক মানসুর আব্বাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। তার দল ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রা’আমের নেতা আব্বাস এবার মধ্য-বামপন্থি ইহুদি নেতা ও পুলিশের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা ইয়োভ সেগালোভিৎজের সঙ্গে জোট বেঁধেছেন। আব্বাসের এই কৌশল, যা ইসরাইলের আরব নাগরিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অংশ নেওয়ার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, তা আরব ও ইহুদি উভয় পক্ষের রাজনীতিকদের সমালোচনার মুখে পড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তার নির্বাচনী প্রচারে বারবার মানসুর আব্বাসের নাম উল্লেখ করছেন। তিনি আব্বাসের দল রা’আমকে কেন্দ্র করে ইহুদি ভোটারদের সতর্ক করছেন, এই বলে যে নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালে আব্বাস পরবর্তী সরকারে প্রকৃত ক্ষমতাধর হয়ে উঠবেন এবং তিনি ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম চালিকাশক্তি। তবে, আব্বাসের ঘোষিত অগ্রাধিকারগুলো পশ্চিম তীর ও গাজার চেয়ে ইসরাইলের আরব নাগরিকদের দৈনন্দিন সমস্যা, যেমন সহিংস অপরাধ, অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম্য এবং আবাসনের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক নীতির সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ আরব নাগরিক এই সমস্যাগুলোর সম্মুখীন।
ইসরাইলের বহুদলীয় সংসদীয় ব্যবস্থায় মানসুর আব্বাস সরকার গঠনের নির্ণায়ক শক্তিতে পরিণত হতে পারেন। বিরোধী নেতারা তার সমর্থন ছাড়া নেতানিয়াহুকে সরানোর মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ জোট গঠন করতে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারেন। এই কারণে, তাকে ইসরাইলের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী আরব রাজনীতিক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তার দল রা’আম, যা ১৯৯৬ সালে ইসরাইলের ইসলামি আন্দোলনের একটি শাখা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, মুসলিম পরিচয় শক্তিশালী করা এবং ইসরাইলের আরব সংখ্যালঘুদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্য রাখে। এই রক্ষণশীল অবস্থান সত্ত্বেও, আব্বাস উদারপন্থি ইহুদি দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করছেন।
এক সাক্ষাৎকারে আব্বাস বলেছেন যে তার লক্ষ্য শুধু বর্তমান সরকারকে পরাজিত করা নয়, বরং এমন একটি সরকার গঠন করা যেখানে আরব নাগরিকেরা অংশীদার হবেন, নিজেদের কথা বলতে পারবেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারবেন। তিনি বর্তমান সরকারকে ‘বর্ণবাদী ও ফ্যাসিবাদী’ বলে অভিহিত করেছেন। ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলের বেদুইন অধ্যুষিত শহর তুবা-জাঙ্গারিয়ায় এক নির্বাচনী সমাবেশে তিনি বলেন, আরবরা ক্ষমতাবানদের টেবিলে অনাথ হয়ে পড়ে থাকবেন না এবং আরব ও ইহুদিদের মধ্যে অংশীদারত্ব গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন।
মানসুর আব্বাস ২০২১ সালে প্রথম বড় আলোচনায় আসেন যখন তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে নতুন সরকারে যোগ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি নেতানিয়াহুর বিরোধীদের সঙ্গে জোট বাঁধেন, যার ফলে নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারান। পরবর্তী বছর নেতানিয়াহু আবার প্রধানমন্ত্রী হন এবং ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে উগ্র ডানপন্থি সরকার গঠন করেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর, যেখানে প্রায় ১,২০০ জন নিহত এবং প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করা হয়, অনেক ইসরাইলির মধ্যে ফিলিস্তিনিদের, এমনকি ইসরাইলের আরব নাগরিকদেরও নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
এই পরিস্থিতিতে, ৫২ বছর বয়সি আব্বাস ইহুদিদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সক্রিয় হন। তিনি ৭ অক্টোবরের হামলার নিন্দা জানান এবং গাজা সীমান্ত এলাকা থেকে পালিয়ে আসা ইসরাইলিদের থাকার ব্যবস্থা করতে সহায়তা করেন। হামাসের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে তিনি বলেন যে সহিংসতার পথ ফিলিস্তিনিদেরই ক্ষতি করেছে। তবে, ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে তিনি এখন প্রায় সব দিক থেকেই আক্রমণের মুখে। নেতানিয়াহু ও তার মিত্ররা তাকে সন্ত্রাসবাদের সমর্থক হিসেবে তুলে ধরছেন, অন্যদিকে একসময় তাকে সাহসী পথিকৃৎ বলা ইহুদি জাতীয়তাবাদী বিরোধী নেতারাও এখন দূরত্ব বজায় রাখছেন। আরব দলগুলোর অন্য নেতারাও আব্বাসের সমালোচনা করছেন, তাকে আপসকামী বা নিজেদের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়া নেতা হিসেবে দেখছেন।
এতসব সমালোচনার মুখেও আব্বাস দমে যাননি। তিনি মুসলিম পুরুষদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে মহানবী (সা.)-এর নেতৃত্ববিষয়ক শিক্ষার কথা তুলে ধরেন এবং বলেন যে একজন নেতার নিজের পথের ওপর আস্থা থাকা প্রয়োজন। এর কয়েক দিন পর, নাজারেতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ঘোষণা করেন যে মধ্য-বামপন্থি রাজনীতিক ও পুলিশের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা ইয়োভ সেগালোভিৎজ তার দল রা’আমের প্রার্থী তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকবেন। মূলধারার আরব ও ইহুদি জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকদের মধ্যে এ ধরনের জোট ইসরাইলের রাজনীতিতে নজিরবিহীন। সেগালোভিৎজকে পাশে নিয়ে আব্বাস বলেন, পরিবর্তন আনতে হলে অন্য ব্যক্তিকে শত্রু হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখতে হবে।
আব্বাস, যার বাবা ছিলেন একজন মুদি দোকানি এবং স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, ছোটবেলা থেকেই বিরোধ মেটানোর কাজে জড়িত ছিলেন। দন্তচিকিৎসক হিসেবে কাজ করার সময় তিনি নিজ শহরে দ্রুজ ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে সংঘর্ষ থামাতে এক মাস নিজের চিকিৎসাকেন্দ্র বন্ধ রেখেছিলেন এবং মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০১৯ সালে ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটে যোগ দেওয়ার পর থেকে তিনি আরব নাগরিকদের ‘জ্বলন্ত সমস্যা’, বিশেষ করে সহিংস অপরাধ ও চাঁদাবাজি ঠেকানোর উপর মনোযোগ দিয়েছেন। তুবা-জাঙ্গারিয়া থেকে ফেরার পথে তিনি জানান যে এসব অপরাধের বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে তিনি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র, আরব, ইহুদি ও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকেও হুমকির মুখে পড়েছেন।
জাতীয় রাজনীতিতে আব্বাসের পরিচিতি মূলত ইহুদিদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার উদ্যোগের কারণে। ২০২১ সালের মে মাসে আরব-ইহুদি দাঙ্গার সময় তিনি লোদের একটি পুড়ে যাওয়া সিনাগগ পরিদর্শন করেন এবং শহরের ডানপন্থি ইহুদি মেয়রকে সঙ্গে নিয়ে সেটি পুনর্নির্মাণে সহায়তার প্রস্তাব দেন। তখন অনেক আরব তার পদত্যাগ দাবি করেছিল, অভিযোগ করে যে তিনি ভুল জায়গায় মনোযোগ দিচ্ছেন। আরব সাংবাদিক মোহাম্মদ মাগাদলি উল্লেখ করেন যে আব্বাসের অবস্থান তখন অনেকে গ্রহণযোগ্য মনে করেননি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের অবস্থানের যথার্থতা বোঝাতে সক্ষম হন।
২০২১ সালে নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারে রা’আমের যোগদান ছিল ইসরাইলের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, কারণ এর আগে আরব দলগুলো সাধারণত সরকারের বাইরে থেকে সমালোচনা করত। আব্বাসের যুক্তি হলো, ক্ষমতায় অংশ নেওয়া ছাড়া বড় ধরনের অর্জন সম্ভব নয় এবং আরব নাগরিকদের অপছন্দের কোনো নীতির দায়ও যদি নিতে হয়, তাতে তিনি প্রস্তুত। তবে, আরব নাগরিকদের একটি অংশ মনে করে যে এই কৌশলের জন্য আব্বাসকে অতিরিক্ত মূল্য দিতে হচ্ছে। তারা মনে করেন, তিনি ইহুদি জাতীয়তাবাদী দলগুলোর শর্তে বেশি ছাড় দিচ্ছেন এবং পশ্চিম তীর ও গাজার ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে খুব কম কথা বলেন।
গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হলেও এ বিষয়ে জোরালোভাবে কথা না বলায় আরব নাগরিকদের একাংশ আব্বাসের সমালোচনা করেছে। আব্রাহাম ইনিশিয়েটিভসের সহসভাপতি বাশায়ের ফাহুম-জাইউসি বলেন, আব্বাসের কৌশলগত আপসের বিষয়টি আরব সমাজে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করেছে। ইসরাইলের ইসলামি আন্দোলনের চেয়ারম্যান সাফওয়াত ফ্রেইজ বলেন, আরব নাগরিকেরা আব্বাসের সব বক্তব্যের সঙ্গে একমত না হলেও, অনেকেই বোঝেন যে তার রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হলো সমঝোতা। অতীতে ফিলিস্তিনপন্থী বিভিন্ন বক্তব্যের জন্য ডানপন্থীদের আক্রমণের মুখে পড়া আব্বাস স্বীকার করেন যে রাজনীতিতে আসার আগে ইহুদি ইসরাইলিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ সীমিত ছিল, যা তার বোঝাপড়ায় প্রভাব ফেলেছিল। সময়ের সঙ্গে তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে এবং অতীতের কিছু বক্তব্য তিনি এখন আর দেবেন না।
আব্বাসের দাবি, তার এই অবস্থান ফিলিস্তিনি প্রশ্ন থেকে সরে আসার অর্থ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে সংঘাত সমাধানের পথ তৈরি করতে চান তিনি। তার মতে, ইসরাইলের ভেতরেই আরব ও ইহুদিরা একসঙ্গে সমস্যা সমাধান করতে পারেন—এটি প্রমাণ করা জরুরি, যার মধ্য দিয়ে যৌথ ভবিষ্যৎ গড়ার আশা ও পারস্পরিক সহযোগিতার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
ইয়োভ সেগালোভিৎজের সঙ্গে আব্বাসের জোট এই কৌশলের একটি উদাহরণ। নেসেটে একসময় তারা একসঙ্গে নির্বাচনে লড়ার বিষয়ে রসিকতা করেছিলেন। সেগালোভিৎজ, যিনি আব্বাসের অংশ নেওয়া জোট সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপমন্ত্রী ছিলেন, আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে অপরাধ দমনে কাজ করাকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছিলেন এবং একটি বিশেষ দল গঠন করেছিলেন, যা হত্যাকাণ্ডের হার ১৬ শতাংশ কমিয়েছিল বলে তার দাবি। ২০২২ সালে নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় ফেরার পর পুলিশের দায়িত্ব উগ্র-ডানপন্থি নেতা ইতামার বেন গভিরকে দেওয়া হলে সেগালোভিৎজের উদ্যোগগুলো পরিত্যক্ত হয় এবং হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বাড়ে। আব্রাহাম ইনিশিয়েটিভসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ইসরাইলে রেকর্ড ২৫২ জন আরব নাগরিক নিহত হন।
তবে আব্বাস ও সেগালোভিৎজের জোটে মতপার্থক্যও রয়েছে। সেগালোভিৎজ আরবি জানেন না, যা নির্বাচনী প্রচারে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করছে। আব্বাস সমকামীদের অধিকারের বিরোধী, অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষ সেগালোভিৎজ এসব অধিকারের সমর্থক এবং তার মেয়েও সমকামী। এসব বিষয়ে মতভেদ থাকা সত্ত্বেও তারা একসঙ্গে কাজ করতে চান। সাবেক প্যারাট্রুপার সেগালোভিৎজকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিলে আব্বাসের জন্য দুটি সুবিধা হতে পারে: প্রথমত, ডানপন্থিদের আক্রমণের জবাব দেওয়া সহজ হবে; দ্বিতীয়ত, রা’আমের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে সরকার গঠন নিয়ে বিরোধী নেতাদের উদ্বেগ কমতে পারে। সেগালোভিৎজ বলেন, আব্বাস সাহসী মানুষ এবং ইসরাইলের ভবিষ্যতের জন্য তাকে একধরনের আশার প্রতীক বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনেই এই আশার বাস্তব পরীক্ষা হবে।
উত্তর ইসরাইলের সাখনিনে এক নির্বাচনী সমাবেশে ভোটার ইহসান বশির (৫৩) আব্বাসকে পরবর্তী সরকারে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান, এমনকি নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকার হলেও, এই আশায় যে এতে অপরাধের মাত্রা কমবে। বশির জানান, সন্তানদের বাইরে যেতে দিতে তিনি ভয় পান। আব্বাস আশা প্রকাশ করেন যে রা’আম নির্বাচনে অনেক আসন পাবে এবং নতুন সরকার বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গঠিত হবে।
















