কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়াল লিখন মুছে ফেলা ও নতুন করে লেখার ‘লুকোচুরি খেলা’ ঘিরে ক্যাম্পাসের রাজনীতি ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মঙ্গলবার গভীর রাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ঢুকে দেওয়াল লিখন মুছে ফেলার অভিযোগ করেছেন ছাত্রছাত্রীরা। তাদের দাবি, মাঝরাতে খবর পেলেও হোস্টেলের বাইরে বেরোতে পারেননি তারা। পরে ক্যাম্পাস থেকে দেওয়াল মুছতে আসা লোকজন চলে গেলে তারা দেওয়ালে সাদা ছোপ দেখতে পান।
রেভলিউশনারি স্টুডেন্টস ফ্রন্টের (আরএসএফ) যাদবপুর ইউনিটের সেক্রেটারি ইন্দ্রানুজ রায় অভিযোগ করেছেন, রাত সাড়ে ১২টা নাগাদ তিনি খবর পান যে, কলকাতা পুলিশ এবং কলকাতা পুরসভার লোক পরিচয় দিয়ে বেশ কয়েকজন ৪ নম্বর গেট দিয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকছে। তারা জানায় যে, পুরসভার লোক দেওয়াল লিখন হোয়াইট ওয়াশ করতে এসেছে এবং পুলিশ তাদের গার্ড দেওয়ার জন্য রয়েছে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বরাবরই বামপন্থি রাজনীতির আঁতুড়ঘর এবং সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐতিহ্য বহন করে আসছে। তাই এখানকার দেওয়ালে সবসময় সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী মনোভাব প্রতিফলিত হয়ে এসেছে। তবে রাজ্যে মমতা বদলের পর একটি হিন্দুত্ববাদী ছাত্র সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বামপন্থি ঐতিহ্য মুছে ফেলতে সক্রিয় হয়েছে।
সম্প্রতি বহিরাগত হামলা ও ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনার পর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বারবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা বিভাগের দেওয়ালে কেন ‘কিষেণজি স্যালুট’ বা ‘কাশ্মীর মাঙ্গে আজাদি’ স্লোগান লেখা থাকে। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন দেওয়ালে ‘দেশবিরোধী’ স্লোগান লেখা আছে এবং এই ‘আবর্জনা’ ধুয়েমুছে সাফ করার কথাও বলেন। মুখ্যমন্ত্রীর এই অলিখিত নির্দেশের পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রাতারাতি সব দেওয়াল লিখন মুছে দিয়েছিল।
তবে ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই দেওয়ালে আবার স্লোগান ফিরে আসে। কার্ল মার্ক্সের উক্তি— ‘আমাদের সময় যখন আসবে তখন আমরা বৈপ্লবিক শক্তি প্রয়োগ করতে দ্বিধা করবো না’—সহ নানা স্লোগান লেখা হয়। পরে সিপিআইএমের ছাত্র সংগঠন এসএফআইয়ের তরফেও দেওয়াল লিখন কর্মসূচিতে নতুন করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াল ভরিয়ে দেওয়া হয়।
এই বিতর্কের আবহে মঙ্গলবার সকালেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য সব পক্ষের কাছে ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য, পরিচ্ছন্নতা ও মর্যাদা বজায় রাখার আবেদন জানিয়েছিলেন। মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে মান্যতা দিয়েও তিনি বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াল বা বিভিন্ন কাঠামোয় যত্রতত্র স্লোগান লিখন, গ্রাফিতি, পোস্টার বা এই ধরনের কোনো কাজ না করে মত প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এমন কর্মকাণ্ডের তীব্র বিরোধিতা করেছে এসএফআই। এসএফআই নেতা তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অঞ্জিল দাস বলেছেন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বরাবরই সাম্রাজ্যবাদ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী। সেই কারণে ক্যাম্পাসের দেওয়ালে সাম্রাজ্যবাদ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী বেশকিছু স্লোগান ছিল। তার দাবি, ‘আরএসএসের (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ) ভূমিকা ফ্যাসিস্টদের মতো। তাই ক্যাম্পাসের দেওয়ালে আরএসএসবিরোধী লেখাও ছিল।’ এসএফআইয়ের মতে, সেই সব স্লোগান মুছে যাদবপুরের ঐতিহ্যকে নষ্ট করা হয়েছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘দেওয়াল লিখন মুছে দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী মনোভাব থেকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে সরাতে পারবে না। দেওয়াল লিখন শুরু করব। আবার একই ধরনের দেওয়াল লিখন হবে।’

















