বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘ দেড় দশকের বহুমাত্রিক রাজনৈতিক সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে বিতর্কের এক চূড়ান্ত পরিণতিতে সেদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। তবে এই গণঅভ্যুত্থানকে কেবল জুলাই-আগস্টের কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ হিসেবে দেখা হলে এর পেছনের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা আড়ালে থেকে যায়। কোনো গণঅভ্যুত্থানই আকস্মিক নয়; এর পেছনে থাকে নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির লড়াই এবং দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের স্ফুরণ।
শেখ হাসিনার শাসনামলে নির্বাচনব্যবস্থা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে দেশে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। এই সময়ে বিএনপিকে দমন-পীড়নের শিকার হতে হয়েছে। দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দেড় লক্ষাধিক রাজনৈতিক মামলা দায়ের করা হয়, যার আসামি প্রায় ৬০ লাখ মানুষ। এ সময় ১,৫৫১ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন এবং অসংখ্য নেতাকর্মী আহত বা গ্রেপ্তার হন। বিএনপির এই দীর্ঘ আন্দোলন সরকারবিরোধী রাজনৈতিক পরিবেশকে সক্রিয় রাখতে এবং গণতন্ত্রের দাবিকে জনপরিসরে জিইয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা পরবর্তী সময়ে ছাত্র আন্দোলনের জন্য একটি অনুকূল ক্ষেত্র তৈরি করেছিল।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন দ্রুতই গণতন্ত্র, জবাবদিহি এবং ন্যায়বিচারের বৃহত্তর দাবিতে রূপ নেয়। শিক্ষক, অভিভাবক, আইনজীবী, সাংবাদিক, শ্রমিক ও কৃষকসহ সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এই আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করায় এটি একটি জাতীয় গণআন্দোলনে পরিণত হয়। এই পর্যায়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখা ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে গেছেন। তিনি নিজেকে আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে আখ্যায়িত করার ধারণা প্রত্যাখ্যান করে এর কৃতিত্ব ছাত্র-জনতাকে দিয়েছেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম ও ইয়ামিনের মতো অসংখ্য তরুণের আত্মত্যাগ এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ১৪২ জন নেতাকর্মীর প্রাণহানি ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয়। এই আন্দোলন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করে। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার উত্তাল গণজোয়ারের মুখে সরকারের পতন ঘটে। তবে এটি কেবল একটি সরকারের পতনের দিন নয়, বরং জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করার পরিণতির শিক্ষা।
বর্তমানে শহীদ পরিবারগুলোর দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ, আহতদের পুনর্বাসন এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডের স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ ও আহতদের যথাযথ স্বীকৃতি এবং পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার ডাক দিয়েছেন। রাজনৈতিক পরিবর্তন কেবল আবেগের ওপর নির্ভর করে না; এর জন্য প্রয়োজন সুদীর্ঘ প্রস্তুতি ও জাতীয় ঐক্য। আজকের বাংলাদেশ নতুন প্রত্যাশা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে বিচারব্যবস্থা স্বাধীন এবং রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত উৎস হবে জনগণ। জুলাই গণঅভ্যুত্থান তাই ৩৬ দিনের আন্দোলন নয়, বরং বহু বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম ও অদম্য প্রত্যয়ের সম্মিলিত ইতিহাস।

















