মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি আঞ্চলিক রাজনীতির স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। শান্তি ও স্থিতিশীলতার নামে যে নতুন আঞ্চলিক কাঠামো গড়ে উঠছে, বাস্তবে তা সামরিক শক্তির ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল একটি মধ্যপ্রাচ্য তৈরি করছে। এই প্রবণতাকে আরও বেগবান করছে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পারস্পরিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত সহযোগিতা।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছেন। গত এক দশকে আমিরাত অর্থনীতি ও মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে যে ‘সফট পাওয়ার’ বা কোমল শক্তি অর্জন করেছিল, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতার ওপর তারা অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আবুধাবির আঞ্চলিক ভূমিকা এখন আর কেবল অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের পর ইসরাইল ও আমিরাতের মধ্যে গোয়েন্দা, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রটি দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সাথে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠতা এই প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করেছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামোর সীমাবদ্ধতাও কাজ করছে। ২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধ দেখিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় মিত্রদের স্বার্থের সংঘাত ঘটলে ওয়াশিংটন নিজস্ব অগ্রাধিকারকেই প্রাধান্য দেয়। ফলে সৌদি আরব, আমিরাত ও কাতারের মতো দেশগুলো এখন নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করছে। এই পরিস্থিতিকে ‘স্থায়ী যুদ্ধের বাস্তবতা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে নিরাপত্তার প্রধান উত্তর হিসেবে অস্ত্র, সামরিক ঘাঁটি এবং প্রতিরক্ষা চুক্তির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এই সামরিকায়ন এক দেশের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিকে অন্য দেশের কাছে হুমকি হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে, যা নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার জন্ম দিচ্ছে।
ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা এই ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। হরমুজ প্রণালি ও জ্বালানি অবকাঠামো এখন বৃহত্তর সংঘাতের কেন্দ্রে। ইরান হরমুজে বিধিনিষেধের হুমকি দিচ্ছে, যার বিপরীতে আমিরাত নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে এই সামরিকীকরণের বিপরীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ হিসেবে রাজনৈতিক সমঝোতা ও আঞ্চলিক সংলাপের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও জোরালোভাবে উঠে আসছে।
ট্রাম্প প্রশাসন এখন ইরানকে নিয়ন্ত্রণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা কি সংঘাত নিরসন করবে, নাকি এটি বৃহত্তর নিরাপত্তা সংকটের অংশ? ফিলিস্তিনি সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া কেবল রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের মূল কারণ দূর করতে সক্ষম কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এখন কেবল শান্তি নাকি স্থায়ী যুদ্ধের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে, তা নির্ধারণ করবে ইরান, সৌদি আরব, তুরস্কসহ অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সম্মিলিত সিদ্ধান্ত। এটি কেবল এক দেশের নিরাপত্তা নীতি নয়, বরং গোটা অঞ্চলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নির্ধারণের লড়াই।
প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১: ৫৭আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১: ৫৭

















