মিরপুর ১ নম্বর সেকশনে অবস্থিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার নামক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটির তিনটি ভবন গুঁড়িয়ে দিয়ে ১০ কাঠার প্লট দখল করে নিয়েছে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। শনিবার থেকে এই কেন্দ্রে সরকারি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা ছিল, যা এখন ব্যাহত হয়েছে। এই পুরো ঘটনায় স্থানীয় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির দিকে অভিযোগের আঙুল উঠেছে।
জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার দিবাগত মাঝরাতে মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা চালায়। তারা প্রথমে দুই নিরাপত্তাকর্মী আন্দ্রিয় সরকার ও আবদুল হাইকে জিম্মি করে মারধর করে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখে। এরপর মূল্যবান যন্ত্রপাতি, ওষুধ, ভ্যাকসিন, নগদ টাকা ও অন্যান্য মালপত্র লুট করে নিয়ে যায়। রাত ১২টার দিকে শুরু হওয়া এই ভাঙচুরের ঘটনায় একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতারের দাবি, এই হামলায় এক কোটি ৯ লাখ টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তিনি এ ঘটনায় বাদী হয়ে শাহ আলী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলার এজাহারে হানিফ মিয়া (৫০) নামের এক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য।
অভিযোগ উঠেছে যে, স্থানীয় বিএনপির দুটি পক্ষ দীর্ঘদিন ধরে জায়গাটি দখল করার চেষ্টা করে আসছিল। গত বৃহস্পতিবার রাতে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে একটি পক্ষ জায়গাটি দখল করে নেয়। স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি এই পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন। তিনি প্রয়াত কাউন্সিলর সাইদুর রহমান নিউটনের স্ত্রী এবং বিএনপির প্রয়াত নেতা ও সাবেক এমপি নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর বোন।
স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, হামলা ও ভাঙচুরের সময় পুলিশকে খবর দেওয়া হলেও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থাপনাটি রক্ষা করতে পারেনি। শাহ আলী থানা-পুলিশ অবশ্য জানিয়েছে, তারা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেবে।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, মিরপুর ১ নম্বর সেকশনের মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট ও ফেয়ার প্লাজা মার্কেটের মাঝের অংশে অবস্থিত টিকাদান কেন্দ্রটির মূল ফটক তালাবদ্ধ। ফটকের ওপর একটি সাইনবোর্ড ঝুলছে, যাতে লেখা, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ থেকে বরাদ্দ পাওয়া ও রেজিস্ট্রি মূলে এই প্লটের মালিক সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড। জমির পরিমাণ ১০ কাঠা।’ কেন্দ্রের পেছনের অংশে সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং তিনটি পাকা ও আধা পাকা ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পলেস্তারা, বাঁশ, খুঁটিসহ নির্মাণসামগ্রী ভেঙে পড়ে আছে। ভবনের কক্ষগুলোর দরজা-জানালা খুলে ফেলা হয়েছে এবং কয়েকটি দরজায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। কক্ষের ভেতরে থাকা আসবাবপত্র, ওষুধ, ভ্যাকসিন, ক্যাপসুল মেঝেতে পড়ে আছে। একটি বড় আমগাছের একাধিক ডালও কেটে ফেলা হয়েছে।
পাশের এক দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘রাত ১০টায় দোকান বন্ধ করে বাসায় যান তিনি। সকালে এসে দেখেন কিছুই নেই। অল্প খরচে গরিব মানুষেরা এখান থেকে টিকা দিতে পারত। অথচ এখন দেখে মনে হচ্ছে ধ্বংসস্তূপ। যারাই করুক, কাজটি ভালো করে নাই।’
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ১৯৭৪ সাল থেকে মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মাতৃ ও শিশুসেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কার্যক্রম শুরু করে। তৎকালীন সুইডিশ সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রতিষ্ঠান রাড্ডা বার্নেনের উদ্যোগে কেন্দ্রটির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা, গর্ভকালীন ও প্রসবোত্তর সেবা, শিশুদের টিকাদান, শিশু স্বাস্থ্যসেবা এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালনা করে। কেন্দ্রটির তিনটি স্থায়ী ক্লিনিকে রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্যাথলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, হেমাটোলজিসহ বিভিন্ন পরীক্ষার সুবিধাও রয়েছে। মিরপুর ১০ এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কেন্দ্র হলেও মিরপুর ১, বাউনিয়াবাঁধ, উত্তরা, ভাসানটেক বস্তি ও পুরান ঢাকায় প্রতিষ্ঠানটির সেবা কার্যক্রম বিস্তৃত রয়েছে। প্রায় ৫০ বছর ধরে সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে দরিদ্র, অসহায় নারী ও শিশুদের বিনা মূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে এই প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠানের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন হিসেবে আছেন বিশিষ্ট শিল্পপতি ও ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান। এশিয়ার নোবেল হিসেবে খ্যাত র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পাওয়া প্রথম বাংলাদেশি নারী ও সমাজকর্মী তাহরুন্নেসা আবদুল্লাহ কোষাধ্যক্ষ হিসেবে রয়েছেন। এছাড়াও সাবেক আমলা আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এ এস এম কাশেম, এ কে আজাদ এবং সাবেক সচিব আবদুল করিম ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবে আছেন। প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক সচিব কাজী ফজলুর রহমান, প্রখ্যাত গাইনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক টি এ চৌধুরী, প্রকৌশলী অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীও প্রতিষ্ঠানটির ট্রাস্টি বোর্ডে ছিলেন।
নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার জানান, পাঁচ-ছয় বছর ধরে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’র নামে কিছু লোক জায়গাটি দখলের চেষ্টা করে আসছিল। ২০২২ সালেও একবার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু সে সময় তারা সফল হয়নি। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে এসে সব গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। জমি দখলের উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালানো হয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
হামলাকারীরা সরকারি ইপিআই টিকা, টিকা প্রদানের সরকারি রেজিস্টার ও নথি, পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও উপকরণ, ওষুধ ও ভ্যাকসিন, দুটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, একটি জেনারেটর, দুটি কম্পিউটার, প্রিন্টার, তিনটি ফ্রিজ, তিনটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি), তিনটি স্টিলের আলমারি, সিসিটিভি ক্যামেরা, চেয়ার-টেবিল ও অন্যান্য আসবাব নিয়ে যায়। যাওয়ার আগে দুর্বৃত্তরা দেয়ালে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যানার টানিয়ে দেয়।
এ বিষয়ে সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ভাঙচুরের ঘটনা তিনিও শুনেছেন। তবে ব্যস্ততার কারণে ঘটনাস্থলে যেতে পারেননি। সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির সঙ্গে তার নাম থাকলেও ভাঙচুরের সঙ্গে তিনি জড়িত নন। যেহেতু ভাঙচুরের মামলা হয়েছে, পুলিশ আইনগতভাবেই ঘটনার তদন্ত করে দেখুক।
শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় মামলা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত করে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মুখোশধারীদের হামলা ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় হওয়া মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে ২০০ থেকে ২৫০ জন মুখোশধারী ব্যক্তি দা, হাতুড়ি, লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রাচীর টপকে ভেতরে ঢুকে পড়ে। টিকাদান কেন্দ্রে থাকা দুই নিরাপত্তাকর্মী আন্দ্রিয় সরকার ও আবদুল হাইকে মারধর করে। পরে তাঁদের একটা খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখে। পুরো ভবনটি দখলে নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রবেশে বাধা দেয়। একপর্যায়ে মূল ফটক ভেঙে ভবন ভাঙার ভারী মেশিন দিয়ে ভবনটির সব কটি কক্ষ ভাঙচুর করে। মামলায় হানিফ মিয়া (৫০) নামের এক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। হানিফ মিয়া ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য।
প্লটটি দখলের চেষ্টা করছিল বিএনপির দুটি পক্ষ আশপাশের লোকজন, স্থানীয় দোকানি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বিএনপির দুটি পক্ষ জায়গাটি দখলের চেষ্টা করছিল। জায়গাটি নিয়ে মামলাও হয়। ফলে এত দিন কেউ দখল করতে পারছিল না। ২০২৬ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’র ব্যানারে আবার দখলের চেষ্টা হচ্ছিল। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বিএনপি নেতা ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি এই পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন। আরেক পক্ষে আছেন কেন্দ্রীয় যুবদলের এক নেতাসহ বেশ কয়েকজন। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে প্রতিষ্ঠানটি ভেঙে জায়গাটি দখল করে নিয়েছে তারা।

















