পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে সরকার ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে মোট ৫ হাজার ৮৩০টি নতুন যানবাহন কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে পিকআপ ভ্যান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য জিপ, সদস্যদের যাতায়াতের জন্য শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস ও মিনিবাস এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত যানবাহন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পুলিশের বিপুলসংখ্যক যানবাহন পুড়ে নষ্ট ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে পুলিশের ৪৫৫টি যানবাহন পুড়ে যায় এবং মোট ১ হাজার ৭৪টি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুরোনো অনেক গাড়িও অভিযানের সময় বিকল হয়ে পড়ে। এছাড়াও, পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামো ও সাজসরঞ্জাম তালিকায় (টিওঅ্যান্ডই) প্রয়োজনীয় যানবাহনের ঘাটতি রয়েছে, যা নিয়মিত অভিযান ও টহল পরিচালনায় সমস্যা সৃষ্টি করছে। এসব কারণে নতুন যানবাহন কেনা জরুরি বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা।
এই সংকট মোকাবিলায় পুলিশ সদর দপ্তর দুটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে ‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অপারেশনাল যানবাহন ক্রয়’ প্রকল্পে ৪ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ হাজার ৮২৯টি সাধারণ যানবাহন কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে, ‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষায়িত যানবাহন ক্রয়’ প্রকল্পে ২ হাজার ২৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ হাজার একটি বিশেষায়িত যানবাহন কেনার প্রস্তাব রয়েছে। এই দুটি প্রকল্পের আওতায় মোট ৫ হাজার ৮৩০টি যানবাহন কেনা হবে।
‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অপারেশনাল যানবাহন ক্রয়’ প্রকল্পের অধীনে ২ হাজার ৯০৯টি ডাবল কেবিন পিকআপ কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে, যার প্রতিটির দাম ৮৬ লাখ টাকা এবং মোট ব্যয় ২ হাজার ৫০১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য ২ হাজার ৭০০ সিসির ৪০০টি জিপ কেনা হবে, প্রতিটির দাম ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, মোট ব্যয় ৬৭৬ কোটি টাকা। এছাড়াও, ২ হাজার সিসির ৩৪৫টি জিপ কেনা হবে, যার প্রতিটির দাম ৭৫ লাখ টাকা এবং মোট ব্যয় প্রায় ২৫৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। দুই ধরনের জিপ মিলিয়ে মোট ৭৪৫টি জিপ কেনা হবে।
একই প্রকল্পে ৫২ লাখ টাকা দরে ২১৪টি মাইক্রোবাস কেনার পরিকল্পনা রয়েছে, এতে ব্যয় হবে প্রায় ১১১ কোটি ২৮ লাখ টাকা। পুলিশ সদস্যদের যাতায়াতের জন্য ৫২ লাখ টাকা দরে ১৪৮টি নন-এসি বড় বাস এবং ১ কোটি ২০ লাখ টাকা দরে ১৪৮টি এসি মিনিবাস কেনা হবে। এছাড়া, ৯৫ লাখ টাকা দরে ১১৫টি প্রিজন ভ্যান, ৬৫ লাখ টাকা দরে ১০০টি প্যাট্রোল কার এবং ৫৫ লাখ টাকা দরে ৫০টি অ্যাম্বুলেন্স কেনার প্রস্তাব রয়েছে। ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০টি স্পিডবোট কেনারও পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় আরও প্রায় ৩০০টি যানবাহন কেনার প্রস্তাব রয়েছে।
‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষায়িত যানবাহন ক্রয়’ প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো পুলিশের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করা। শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষসহ বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১টি আর্মড পারসোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি) কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। জনশৃঙ্খলা রক্ষা ও উত্তেজিত জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণে ১০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ২০টি ওয়াটার ক্যানন কেনা হবে, এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২৮ কোটি টাকা। জনসমাবেশ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০টি ক্রাউড কন্ট্রোল ভেহিকেল কেনারও পরিকল্পনা রয়েছে।
পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের জন্য ১৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫টি সোয়াট ভ্যান, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত অভিযান পরিচালনার জন্য ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০টি বিশেষায়িত প্যাট্রোল কার এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের নিরাপত্তাবেষ্টিত অবস্থায় পরিবহনের জন্য ৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩টি বিশেষায়িত ভ্যান কেনার প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের থানা থেকে আদালতে এবং আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার জন্য ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৫টি প্রিজন ভ্যান কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
উচ্চগতিতে চলাচলের উপযোগী ২০০টি মোটরসাইকেল কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে, এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬০ কোটি টাকা। পুলিশের প্রশিক্ষিত কুকুর পরিবহনের জন্য ৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫০টি ইউটিলিটি টেরেইন ভেহিকেল কেনা হবে। দুর্গম এলাকায় অভিযান ও টহলের জন্য ৫০টি অল টেরেইন ভেহিকেল এবং পাহাড়ি এলাকায় চলাচলের জন্য ১০০টি হিল মোটরসাইকেল কেনার প্রস্তাব রয়েছে। পুলিশের গোয়েন্দা কার্যক্রম ও মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য ১১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ছয়টি মোবাইল সার্ভিল্যান্স গাড়ি কেনা হবে। উপকূলীয়, নদী ও পাহাড়ি এলাকায় দ্রুত চলাচলের জন্য ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫টি কুইক রেসপন্স বোট বা স্পিডবোট এবং পানিতে আটকে পড়া মানুষ ও দুর্ঘটনায় পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধারে আরও ১৫টি রেসকিউ বোট কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিভিন্ন ইউনিটের কমান্ডারদের মাঠপর্যায়ে যাতায়াতের জন্য ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০৫টি কমান্ডারস সাব-আরবান ভেহিকেল, মৃতদেহ পরিবহনের জন্য ৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮০টি ফ্রিজার ভ্যান এবং নির্বাচন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সমাবেশে পুলিশ সদস্যদের ব্যবহারের জন্য ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮০টি স্মল ডিপ্লয়মেন্ট ইউটিলিটি ভেহিকেল কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। পুলিশের আনুষ্ঠানিকতা ও প্রশিক্ষণের কাজে ঘোড়া পরিবহনের জন্য ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে বিশেষ ধরনের ১০টি যানবাহন কেনা হবে। এই প্রকল্পের আওতায় আরও প্রায় ৫৬টি যানবাহন কেনার প্রস্তাব রয়েছে। স্বরাষ্ট্রসচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী জানিয়েছেন, পুলিশ বাহিনীর যেসব সদস্য জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যাবেন, তাঁদের জন্যও কিছু বিশেষায়িত যানবাহন কেনা হচ্ছে, যার ব্যয় জাতিসংঘ পরবর্তী সময়ে পরিশোধ করবে।
তবে এত বিপুল অর্থের জোগান দেওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন পরিকল্পনা কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, যানবাহন কেনার পাশাপাশি জ্বালানি, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বহনের পরিকল্পনাও থাকতে হবে। কেনাকাটার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং নতুন যানবাহনের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় জিপ কেনার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করেছে। বিপুলসংখ্যক যানবাহন কেনার পর সেগুলোর জ্বালানি, মেরামত, যন্ত্রাংশ, টায়ার, বিমা ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় কীভাবে মেটানো হবে, তার স্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। বিশেষায়িত যানবাহনের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।
প্রকল্প দুটি আগামী ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে। অনুমোদন পেলে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের প্রাক্কলন কমিটি, যেখানে বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের এক সহকারী অধ্যাপকসহ পাঁচজন সদস্য ছিলেন, এসব যানবাহনের দাম নির্ধারণ করেছে। এছাড়া, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য অতিরিক্ত আইজিপি মুশফেকুর রহমানের সভাপতিত্বে ৯ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
স্বরাষ্ট্রসচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের প্রচুর গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সারা দেশে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাদের চাহিদা অনেক বেশি, এ কারণে বেশি করে পিকআপ কেনা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পুলিশের নিজস্ব ব্যবস্থা রয়েছে, তবে গাড়িগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমেরও ভূমিকা রয়েছে।
এসব কারণে নতুন যানবাহন কেনা জরুরি।.সংকট কাটাতে পুলিশের জন্য কেনা হচ্ছে ৪৩১ যানবাহন.তবে এত বিপুল অর্থের জোগান দেওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে পরিকল্পনা কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের।
পানিতে আটকে পড়া মানুষ ও দুর্ঘটনায় পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধারে আরও ১৫টি রেসকিউ বোট কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে।.র্যাবের জন্য ১৬৩টি গাড়ি কেনা হচ্ছে, খরচ ১২২ কোটি টাকা.বিভিন্ন ইউনিটের কমান্ডারদের মাঠপর্যায়ে যাতায়াতের জন্য ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০৫টি কমান্ডারস সাব–আরবান ভেহিকেল কেনা হবে।

















