দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শারীরিক অসুস্থতার কারণে পদত্যাগ করছেন। তার পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল শনিবার বা পরশু রোববার তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করতে পারেন। তবে স্পিকার দেশে না থাকায় পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতির দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা এবং তার ঘনিষ্ঠ একজন ব্যক্তি নিশ্চিত করেছেন যে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ চিকিৎসার জন্য গত ১৯ জুলাই থাইল্যান্ডে গেছেন এবং তার ২৬ জুলাই ফেরার কথা রয়েছে। তবে তার আগেই স্পিকার দেশে ফিরতে পারেন বলে আভাস পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব মো. নূরুল আমীন জানান, রাষ্ট্রপতি এখনো পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেননি এবং পদত্যাগ করলে তা জানানো হবে। বঙ্গভবনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, স্পিকার দেশে না থাকায় রাষ্ট্রপতি চাইলেও এখনই পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারছেন না। তিনি আরও জানান, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা স্বাস্থ্যগত বা মানসিক যেকোনো কারণেই হতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, সরকার রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করতে বলেনি। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি চাইলে পদত্যাগ করতে পারেন এবং এই বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি। তিনি স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করতে চান কিনা, তা রাষ্ট্রপতিকেই জিজ্ঞেস করতে হবে।
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়া মো. সাহাবুদ্দিনের পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি দায়িত্ব ছাড়ছেন।
বিএনপির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে দলের উচ্চপর্যায় থেকে পদত্যাগ করার বার্তা দেওয়া হয়েছে। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। সরকারের অভ্যন্তরে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে কোনো সংশয় নেই বলেও সূত্রটি জানিয়েছে।
সূত্রমতে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আলোচনায় আসেন। আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক নিযুক্ত এই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে তখন বিক্ষোভ হয়েছিল। পরবর্তীতে ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশ পরিচালনা করে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার শপথ নেওয়ার পরও সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সরকারের পাঁচ মাস পর আবারও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়টি জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে।
বঙ্গভবনের এক কর্মকর্তা গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা স্পষ্টভাবে জানান। তিনি রাষ্ট্রপতির অসুস্থতাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, রাষ্ট্রপতি নিউরো জটিলতায় ভুগছেন এবং চিকিৎসকরা তাকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সাহাবুদ্দিন পদত্যাগের বিষয়টি সহজভাবে ভাবছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তিনি জানিয়েছিলেন যে, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবে, এটাই স্বাভাবিক এবং তিনি এ ব্যাপারে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, রাষ্ট্রপতি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে চাইলে স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে তা করতে পারেন। এক্ষেত্রে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগে কোনো সংকট হবে না, কারণ এর আগেও রাষ্ট্রপতি ড. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর তৎকালীন স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদত্যাগ করতে পারবেন। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে বা তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে স্পিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত বা রাষ্ট্রপতি পুনরায় কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন। সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ বছরের জন্য ৭৫ বছর বয়সী সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তিনি পূর্বে দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার হিসেবে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু নামে পরিচিত ছিলেন। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হলেও দেশের কার্যনির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে থাকে। দায়িত্ব নেওয়ার ১৬ মাস পর তিনি এক অভাবনীয় পরিস্থিতির সম্মুখীন হন।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনা দেশ ছাড়লে সাহাবুদ্দিন বঙ্গভবনে থেকে যান। তাকে সংসদ বিলুপ্তির আদেশ দিতে হয়, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পড়াতে হয় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোকে অধ্যাদেশে পরিণত করতে হয়। এমনকি নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নতুন সরকারের শপথও তিনি পড়ান।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মো. সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ধ্বংস ও সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টির অনেক চক্রান্ত হয়েছিল, কিন্তু তিনি দৃঢ়চিত্তে নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকায় কোনো ষড়যন্ত্র সফল হয়নি। তিনি ওই সাক্ষাৎকারে বিএনপির কাছ থেকে ‘শতভাগ সমর্থন’ পাওয়ার কথাও উল্লেখ করেন।
সাহাবুদ্দিন ১৯৭১ সালে মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তিনি ১৯৭৪ সালে পাবনা জেলা যুবলীগের সভাপতি এবং ১৯৭৫ সালে পাবনা জেলা বাকশালের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিচার) ক্যাডারে যোগ দিয়ে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে ২০০৬ সালে অবসর গ্রহণ করেন। ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার ছিলেন। তার স্ত্রী ড. রেবেকা সুলতানা সরকারের যুগ্ম সচিব ছিলেন এবং তাদের একমাত্র সন্তান মো. আরশাদ আদনান। তার দুই যমজ নাতি তাহসিন মো. আদনান ও তাহমিদ মো. আদনান। ভ্রমণ, বই পড়া ও গান শোনা তার প্রিয় শখ।

















