প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬: ২৮। ঝিনাইদহ জেলায় আত্মহত্যার প্রবণতা দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে, যা স্থানীয় পর্যায়ে চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় এখানে আত্মহত্যার হার অনেক বেশি। বিভিন্ন গবেষণা ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই জেলায় প্রতি বছর গড়ে তিন থেকে চার শতাধিক মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নেন। পারিবারিক কলহ, মানসিক অশান্তি, কীটনাশকের সহজলভ্যতা, মাদকাসক্তি এবং বেকারত্বকে এই প্রবণতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন অনেকে। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার উচ্চ হার বিষয়টিকে আরও বেশি উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
ঝিনাইদহ পুলিশ সুপারের দপ্তরের তথ্যমতে, ১৯৭১ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত আত্মহত্যার কোনো সুনির্দিষ্ট রেকর্ড না থাকলেও, সেই সময়ে প্রায় ২৫ হাজার অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল বলে ধারণা করা হয়। ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ঝিনাইদহে ৩,১৫২ জন আত্মহত্যা করেছেন এবং একই সময়ে ২২ হাজার ৬৭ জন আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন। ২০২০ সালে ৩২০ জন আত্মহত্যা করেন, যার মধ্যে ৪৭ শতাংশই ছিলেন পুরুষ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারীদের আত্মহত্যার হার তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৩২৮ জন, ২০২২ সালে ৩২৩ জন, ২০২৪ সালে ৩১৯ জন এবং ২০২৫ সালে ৩০১ জন আত্মহত্যা করেছেন। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জেলায় ১৮৯ জন আত্মহত্যা করেছেন, যাদের মধ্যে ৯৭ জন নারী ও ৯২ জন পুরুষ। গত চার বছরে জেলায় মোট ১,২৭১ জন মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন।
বয়স বিবেচনায় দেখা গেছে, ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি। তবে ইদানিং শিশুদের মধ্যেও এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জেলার ছয়টি উপজেলার মধ্যে শৈলকূপা উপজেলা আত্মহত্যার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। ‘সোসাইটি ফর ভলান্টারি অ্যাকটিভিটিজ-শোভা’ নামক একটি বেসরকারি সংস্থা ঝিনাইদহকে আত্মহননের জন্য ‘লাল তালিকাভুক্ত’ করেছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম জানান, এ অঞ্চলের মানুষের মানসিক প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং রাগ-অভিমান বেশি।
আত্মহত্যার এই ব্যাধি রোধে সচেতনতার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তপন কুমার রায় জানান, জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা এবং আবেগপ্রবণ মানুষই সাধারণত আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাসান বলেন, আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এবং পুলিশ এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির কাজ করছে। এদিকে, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাজেদুর রহমান পাপ্পু জানিয়েছেন, আত্মহত্যার মতো নেতিবাচক প্রবণতা দূর করতে সভা-সেমিনারের মাধ্যমে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এছাড়া ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, জীবনের সফলতা ও ব্যর্থতাকে মেনে নেওয়ার মানসিকতা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে সমাজ থেকে এই আত্মহননের সংস্কৃতি দূর করতে।
ঝিনাইদহ জেলায় ২০১০ সালে আত্মহত্যা করেছে ৩৮০ জন আর আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে ২,১০৯ জন। ২০১১ সালে আত্মহত্যা করেছে ৩০৯ জন, চেষ্টা করেছে ২,৮৪৯ জন; ২০১২ সালে আত্মহত্যা করেছে ২৯৫ জন, চেষ্টা করেছে ২,৫৮৩ জন; ২০১৩ সালে আত্মহত্যা করেছে ৩১১ জন, চেষ্টা করেছে ২৬৩৯ জন; ২০১৪ সালে আত্মহত্যা করেছে ৩০৩ জন, আর চেষ্টা করেছে ২,৪০৯ জন এবং ২০১৫ সালে আত্মহত্যা করেছে ৩৬৩ জন আর চেষ্টা করেছে ২,৬০০ জনের উপরে। ২০১০ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ঝিনাইদহে ৩,১৫২ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছে। একই সময়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে আরো ২২ হাজার ৬৭ জন। এরপর দুই বছরের মাথায় ২০২০ সালে ঝিনাইদহে আত্মহত্যাকারীদের ৪৭ শতাংশই ছিল পুরুষ। ২০২০ সালে ৩২০ জন আত্মহত্যা করেন। পুরুষ আত্মহত্যাকারীর সংখ্যা ছিল ১৫১ আর নারী ছিল ১৬৯ জন।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী জেলায় গড়ে প্রতি বছর আত্মহত্যার পথ বেছে নেন ৩৫০ জন এবং আত্মহত্যার চেষ্টা করেন দুই হাজারেরও বেশি নারী-পুরুষ। বয়স হিসাবে দেখা গেছে, ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সিরা বেশি আত্মহত্যা করে। সাম্প্রতিক সময়ে জেলাব্যাপী শিশুদের মাঝেও আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা গেছে।

















