বাংলাদেশ

চকরিয়ায় সংরক্ষিত বনে পাহাড় কেটে সড়ক, কাজ চলছে নিষেধাজ্ঞার পরও

প্রতিবেদক
সব খবর

কক্সবাজারের চকরিয়ায় প্রায় শতবর্ষী হারবাং সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে প্রায় ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পাকা সড়ক নির্মাণ করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। বন বিভাগের আপত্তি ও কাজ বন্ধের নির্দেশ সত্ত্বেও ঠিকাদারের লোকজন পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের উত্তর হারবাং ফরেস্ট অফিসের পাশ থেকে পূর্ব দিকে সরু একটি পথ ধরে এগোলেই চোখে পড়ে পাহাড়-টিলা কাটার চিহ্ন। গত রোববার বিকেলে পথটির শুরুতেই উত্তর পাশের একটি টিলা কেটে সড়কের সঙ্গে সমান করা হয়েছে। আধা কিলোমিটার এগিয়ে উত্তর করমুহুরীপাড়ায় এবং সাবানঘাটা সেতুর পর প্রায় ৬০০ ফুটজুড়ে পাহাড় কেটে পথ চওড়া করা হয়েছে। কোথাও ৫ ফুট থেকে ৯ ফুট উঁচু পাহাড় কাটা হয়েছে, যার কাটা অংশ ১০ থেকে ১২ ফুট চওড়া। এতে কয়েকটি গাছও কাটা পড়েছে।

এই প্রায় ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২৫ কোটি ৩ লাখ টাকা। বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) যৌথভাবে এই প্রকল্পে অর্থায়ন করছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সড়কটির প্রায় ৪ কিলোমিটার গেজেটভুক্ত সংরক্ষিত বনের মধ্যে পড়েছে।

এই হারবাং বনে বন্য হাতি চলাচল করে এবং সড়কের পাশে রয়েছে গর্জনগাছ ও প্রায় ৫০ একরের সুফল বনায়ন। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সরু পথ পাকা ও প্রশস্ত হলে বনের ভেতরে গাড়ি ও মানুষের প্রবেশ সহজ হবে, যা গাছ চুরি, বন্য প্রাণী শিকার ও নতুন করে বনভূমি দখলের সুযোগ বাড়াবে। যানবাহন বাড়লে বন্য হাতির চলাচলেও বাধা তৈরি হতে পারে এবং আবাসস্থল ও চলাচলের পথ সংকুচিত হলে হাতি লোকালয়ে ঢুকে পড়ার ঝুঁকিও বাড়বে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আইন অনুযায়ী বনের ভেতর সড়ক নির্মাণের সুযোগ নেই। প্রতিটি সংস্থার এ আইন মেনে চলা উচিত। বনের ভেতর সড়ক হলে জবরদখলসহ নানা সমস্যা তৈরি হয়। তিনি বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান। বন বিভাগের নজরে পাহাড় কাটার বিষয়টি আসে গত ১৭ সেপ্টেম্বর। এর পাঁচ দিন পর চুনতি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আবীর হাসান এলজিইডিকে চিঠি দিয়ে সংরক্ষিত বনের ভেতর কাজ বন্ধ করতে বলেন। তবে এই চিঠির পরও কাজ থামেনি।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সোহেল রানা বলেন, পাকা সড়ক হলে বনের ভেতর জবরদখল বাড়বে, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ঝুঁকিতে পড়বে এবং হাতির চলাচলেও বাধা তৈরি হবে। এ ঘটনায় বন বিভাগ আইনগত ব্যবস্থা নেবে।

এলজিইডির ‘দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের’ পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম জানান, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছিল ২০২০ সালে এবং ভুল হতেই পারে। তিনি বলেন, তারা এই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চান না এবং রিজার্ভ ফরেস্টের দিকে কাজ করবেন না বা করা উচিত হবে না। হারবাংয়ের বিষয়ে বন বিভাগের চিঠি পাওয়ার পর কাজ বন্ধ রাখতে বলেছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, রিজার্ভ ফরেস্টের মধ্যে কাজ করা তাদের ম্যান্ডেটও নয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন বলেন, সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণ হলে বন খণ্ডিত হবে। এতে অবৈধ প্রবেশ, জবরদখল ও গাছ কাটা বাড়বে, যা জীববৈচিত্র্যকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলবে।

হারবাং ছাড়াও চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের আরও তিনটি সংরক্ষিত বন এলাকায় সড়ক নির্মাণ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বন বিভাগ। এর মধ্যে চকরিয়ার মধুশিয়া গর্জনবন (হাতি করিডরের অংশ), সাতকানিয়ার বৈতরণি সংরক্ষিত বন এবং মহেশখালীর শাপলাপুর সংরক্ষিত বন রয়েছে। মধুশিয়া গর্জনবনের ভেতর দিয়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পাকা সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বন বিভাগ অনাপত্তি দেয়নি।

মহেশখালীর শাপলাপুরে সংরক্ষিত বনের ভেতর সাড়ে চার কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করছে এলজিইডি, যার ব্যয় ২২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা (জাইকার অর্থায়নে)। এই সড়কের সংরক্ষিত বনের ভেতরের ৩ দশমিক ৭০ কিলোমিটার অংশে নির্মাণকাজের ওপর গত ৬ আগস্ট হাইকোর্ট দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন, এরপরও সেখানে কাজ চলার তথ্য পাওয়া যায়। অন্যদিকে, সাতকানিয়ার বৈতরণি সংরক্ষিত বনের ভেতরেও দুটি সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ রয়েছে, যার মধ্যে একটি ৫৭০ মিটার দীর্ঘ বড়ুয়াপাড়া সড়ক পুরোটাই সংরক্ষিত বনের মধ্যে এবং সুয়ালক সেতু থেকে সিদ্দিক খামার পর্যন্ত ৬০০ মিটার সড়কের প্রায় ১৭০ মিটার সংরক্ষিত বনে পড়েছে বলে বন বিভাগ দাবি করেছে।

আমিরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের আওতায় সরাসরি বিভিন্ন কাজ বাস্তবায়নে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে।

সব খবর