উন্নত জীবন ও ভালো চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন অনেক বাংলাদেশি। গত তিন বছরে অন্তত ৫৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যাদের মরদেহও দেশে আনা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতারণার মাধ্যমে এসব কর্মীকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।
লালমনিরহাটের আবদুল্লাহ আল মামুন পরিবারের ভাগ্য ফেরাতে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে যুদ্ধের ক্যাম্পে ঠাঁই হয় তার। প্রশিক্ষণ শেষে যুদ্ধে পাঠানোর আগের দিন ছোট ভাইকে তিনি বলেছিলেন, ‘যুদ্ধে পাঠিয়ে দিচ্ছে, আর দেখা না-ও হতে পারে।’ এরপর তার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে জানা যায়, মামুন মারা গেছেন। তার পরিবার এখন ঋণগ্রস্ত এবং অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।
গত ৭ মে মামুনসহ ৩০ জন বাংলাদেশি ভালো বেতনের চাকরির আশায় রাশিয়ায় যান। সেখানে ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাদের যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়। এদের অনেকেই ১২ ও ১৩ জুনের দিকে মারা যান। দুজন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর পালিয়ে দেশে ফিরে আসেন। তারা হলেন নারায়ণগঞ্জের আদনান হোসেন ও ঝিনাইদহের রাজন হোসেন। তারাই অন্যদের মৃত্যুর তথ্য প্রথম আলোকে জানিয়েছেন।
আদনান হোসেন জানান, যুদ্ধে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর তথ্য রাশিয়া প্রকাশ করে না এবং মরদেহও দেশে পাঠায় না। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কেউ না ফিরলে তাকে নিখোঁজ বলে দেওয়া হয়, যার অর্থ মৃত্যু। আদনান নিজে পেটে স্প্লিন্টার নিয়ে মস্কোর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, তিন দফা অস্ত্রোপচার হয় তার। দেড় মাস পর তিনি পালিয়ে দূতাবাসে গিয়ে ট্রাভেল পাস নিয়ে দেশে ফেরেন।
রাশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস বিভিন্ন সময়ে যাচাই-বাছাই ছাড়া কর্মী পাঠানো নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। গত ২৫ মে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে দূতাবাসের শ্রম উইং থেকে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, রিক্রুটিং এজেন্সি জাবালে নূর ও আর এস ইন্টারন্যাশনাল সন্দেহজনক হওয়ায় তাদের মাধ্যমে কর্মী পাঠানো স্থগিত করা হয়। পরে জানা যায়, দুটি এজেন্সি সত্যায়ন করাতে না পারায় টিএস ওভারসিজের নামে কর্মীদের পাঠিয়েছে। দূতাবাস কর্মীদের যুদ্ধে না পাঠিয়ে নিয়োগপত্র অনুযায়ী কাজে ফিরিয়ে আনতে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠাচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, চার-পাঁচ মাস ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে নিখোঁজ ও নিহত বাংলাদেশিদের তথ্য রাশিয়া সরকার দূতাবাসকে জানাচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৪০ জনের তথ্য তারা দিয়েছে, তবে নিহত ও নিখোঁজের সংখ্যা আলাদা করে বলেনি। সর্বশেষ ২০ জনের মৃত্যুর বিষয়েও দেশটির পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি। যুদ্ধে কেউ মারা গেলে বা ছয় মাসের বেশি নিখোঁজ থাকলে ক্ষতিপূরণ দাবির সুযোগ থাকলেও, রাশিয়ায় ক্ষতিপূরণ নেওয়ার প্রক্রিয়া জটিল এবং মরদেহ উদ্ধার করা যায় না।
রাশিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. নজরুল ইসলাম বলেছেন, ৯০ শতাংশের বেশি কর্মী নিজে থেকেই যুদ্ধে যান এবং ৩০ জনের বিষয়েও রাশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে তারা স্বেচ্ছায় যুদ্ধে গিয়েছেন। রাশিয়ার কাছে এর লিখিত প্রমাণ আছে। কর্তৃপক্ষ মরদেহ হস্তান্তর করছে না, তাই দেশেও পাঠানো যাচ্ছে না।
এসআরবি, গোয়েন্দা বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কর্মীরা যুদ্ধের জন্য শারীরিক সামর্থ্য, প্রশিক্ষণ বা কৌশলের দিক থেকে যোগ্য নন। তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
ব্যাংককভিত্তিক ফোর্টিফাই রাইটস এবং ইউক্রেনভিত্তিক ট্রুথ হাউন্ডস গত মার্চে জানায়, রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেওয়া শতাধিক বাংলাদেশি তরুণের মধ্যে ৩৪ জন নিহত হয়েছেন। ১৪ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) জানায়, ৩০ জন বাংলাদেশিকে ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে জুনে যুদ্ধে পাঠানো হয় এবং তাদের অন্তত ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে এসআরবি।
আহত হয়ে দেশে ফেরা দুজন এবং আরও ছয়জনের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জুনে যুদ্ধে পাঠানোর আগেই কর্মীরা পরিবারের কাছে আকুতি জানিয়েছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত বিদেশিদের মরদেহ উদ্ধার করা হয় না, মাঠেই ফেলে রাখা হয়।
রাশিয়া বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন শ্রমবাজার হয়ে উঠেছে। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই দেশটিতে কর্মী পাঠানো বাড়তে শুরু করে। এ সুযোগে একটি চক্র বাংলাদেশি কর্মীদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য পাঠাচ্ছে।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড বলছে, প্রবাসে কোনো কর্মী মারা গেলে তার মরদেহ দেশে আনার দায়িত্ব নেয় কল্যাণ বোর্ড। মৃত্যুর প্রমাণ না থাকায় রাশিয়া থেকে মরদেহ আনার কোনো আবেদন এখন পর্যন্ত কল্যাণ বোর্ডে আসেনি, ফলে কেউ কোনো ক্ষতিপূরণও পাচ্ছেন না।
ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, মানব পাচারে অভিযুক্ত এজেন্সিগুলো রাশিয়ায় সবচেয়ে বেশি কর্মী পাঠাচ্ছে। কতজন কাজ পেয়েছেন, বাকিরা কোথায় আছেন, তার হিসাব কারও কাছে নেই। মৃতদেহও পায় না পরিবার, পায় না কোনো ক্ষতিপূরণ।
এসআরবি জানিয়েছে, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওই ৩০ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজের কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুত চাকরি না দিয়ে তাদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় মানব পাচার চক্রের হোতা জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান ও আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রাশিয়া যেতে ছাড়পত্র নিয়েছেন মাত্র ৩৭ জন। পরের বছর এটি বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৯৫ জনে। ২০২৫ সালে দেশটিতে যেতে ছাড়পত্র নিয়েছেন ৪ হাজার ৭২৫ জন। এ বছরের ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত রাশিয়ায় যেতে ছাড়পত্র নিয়েছেন ৩ হাজার ১০৫ জন।
মো. পলাশ শেখ নামের এক বাংলাদেশি যুদ্ধে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, পরে দ্বিতীয় দফায় যুদ্ধে গিয়ে হাত হারান। তার ফুফাতো ভাই জানান, পলাশ চাকরির প্রলোভনে প্রতারিত হয়েছেন এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে দূতাবাস ও মন্ত্রণালয়ে বলেও কোনো সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না।
নিখোঁজ স্বজনদের ফিরিয়ে আনতে গত জুলাইয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে ২৮টি চিঠি জমা দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, উচ্চ বেতনের প্রলোভনে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে তাদের বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে এবং দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে অনুরোধ করা হয়েছে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, সরকার কর্মীদের এভাবে যেতে নিরুৎসাহিত করছে। নিশ্চিত চাকরির তথ্য যাচাই-বাছাই ও সত্যায়ন না করে কাউকে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে না।
গত ৭ মে ৩০ জনের দলে রাশিয়া যাওয়া ঝিনাইদহের রাজন হোসেন বলেন, দালালকে ১০ লাখ টাকা দিয়েও চাকরি পাননি। ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয় তাকে। ড্রোন হামলায় চারজন মারা যান, তিনি আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে পালিয়ে দেশে আসেন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ছয় মাস থাকলে নাগরিকত্ব ও মাসে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা বেতনের সুযোগ থাকায় অনেকে নিজ থেকেই যুদ্ধে যাচ্ছেন।
ব্র্যাকের গবেষণা অনুযায়ী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে মোট কতজন বাংলাদেশি জড়িয়েছেন, কতজন নিহত হয়েছেন বা কতজন আটকে আছেন, তার হিসাব কারও কাছে নেই। রাশিয়ায় বাংলাদেশিদের পাচারের অভিযোগে অন্তত ছয়টি মামলা হয়েছে বলে সিআইডি সূত্র জানিয়েছে।
প্রথম আলোর অনুসন্ধান বলছে, গত চার বছরে রাশিয়ায় কর্মী পাঠাতে ৯৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির নামে ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে টিএস ওভারসিজ নামের একটি এজেন্সি ২৬৬ জনের নামে ছাড়পত্র নিয়েছে। সবচেয়ে বেশি কর্মী পাঠানো বন্যা বিজয় ওভারসিজ ২৭ শতাংশ কর্মী পাঠিয়েছে। এই এজেন্সির বিরুদ্ধে মানব পাচারের অভিযোগ আছে।
৩০ কর্মী পাঠানোর সঙ্গে যুক্ত জাবালে নূর, টিএস ওভারসিজ ও আরএস ইন্টারন্যাশনালের লাইসেন্স বাতিল করেছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। বন্যা বিজয়ের সার্ভার লক করে দেওয়া হয়েছে।
সরকারি এজেন্সি বোয়েসেলের একজন কর্মকর্তা জানান, তারা রাশিয়ার তিনটি কোম্পানিতে কর্মী পাঠাচ্ছিলেন। এর মধ্যে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে এবং এরপর দুটি কোম্পানি কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয়।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, যারা মারা গেছেন বলে পরিবার খবর পেয়েছে, তাদের মরদেহ খুঁজে বের করা কঠিন কাজ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।.রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে মোট কতজন বাংলাদেশি জড়িয়েছেন, কতজন নিহত হয়েছেন কিংবা কতজন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে আছেন, তার হিসাব কারও কাছে নেই।.চাকরির আশায় রাশিয়া গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারালেন কিশোরগঞ্জের যুবক.বিএমইটির তথ্য বলছে, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭৭১ জন কর্মীর ছাড়পত্র নিয়েছে সরকারি এজেন্সি বোয়েসেল।

















