দেশের ১৬টি সরকারি মেডিকেল কলেজ জমি, নিজস্ব ভবন, প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকটে ভুগছে। তুলনামূলকভাবে নতুন এসব মেডিকেল কলেজ ২০০৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হলেও আট বছর পরও অনেকগুলো নিজস্ব ক্যাম্পাস বা হাসপাতাল পায়নি। এমন পরিস্থিতিতেও নতুন নতুন সরকারি মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেওয়া অব্যাহত রেখেছে বিভিন্ন সরকার।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ১৬টি সরকারি মেডিকেল কলেজের মধ্যে পাঁচটি কলেজের নিজস্ব জমি নেই, যার ফলে ভবনও নেই। কলেজগুলো হলো হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, নওগাঁ, মাগুরা ও নীলফামারী মেডিকেল কলেজ। হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও ১০ বছর পরও এর নিজস্ব জমির বন্দোবস্ত হয়নি। শহরের প্রায় কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতালের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও অষ্টম তলায় কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। ২০১৮ সালে নিজস্ব জমি, ভবন ও ক্যাম্পাসের ব্যবস্থা না করেই মাত্র তিন হাজার বর্গফুট জায়গায় পাঁচটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষাদান শুরু হয়। এই কলেজের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নিজস্ব হাসপাতাল না থাকায় তাদের সদর হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হয়, যেখানে রেজিস্ট্রার না থাকায় হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের তদারকি করার কেউ নেই।
একইভাবে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসানের ইচ্ছায় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমর্থনে ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজের নামেও কোনো জমি নেই। হাসপাতাল কোথায় হবে, জমি কীভাবে পাওয়া যাবে—এসব ঠিক না করেই কলেজটি প্রশাসনিক ও একাডেমিক অনুমোদন পায়। আট বছর পরও নিজস্ব ভবন বা ক্যাম্পাস না থাকায় ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতালের উত্তর পাশে চিকিৎসকদের জন্য তৈরি চারটি ভবনকে একাডেমিক ভবন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা স্থায়ী ক্যাম্পাসের দাবিতে মানববন্ধনও করেছেন।
চাঁদপুর মেডিকেল কলেজের জন্য জমি কেনার প্রক্রিয়া চলছে এবং এটি সদর হাসপাতালের কয়েকটি কক্ষে পরিচালিত হচ্ছে। বাকি ১০টি কলেজের জমি ও নিজস্ব কলেজ ভবন থাকলেও পাবনা, যশোর ও জামালপুর মেডিকেল কলেজের এখনো কোনো নিজস্ব হাসপাতাল নেই। ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত পাবনা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা ৩১ আগস্ট প্রথম আলোকে জানান, কলেজ থেকে জেলা সদর হাসপাতালের দূরত্ব প্রায় আট কিলোমিটার। ২৪০ জন শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র একটি বাস থাকায় প্রতিদিন যাতায়াত কষ্টকর হয়ে ওঠে।
শিক্ষক সংকট এই ১৬টি মেডিকেল কলেজের একটি বড় সমস্যা। প্রথম আলোর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সব কলেজেই শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। মাগুরা মেডিকেল কলেজে ৮৪টি পদের মধ্যে ৩২ জন কর্মরত আছেন, ৫২টি পদ শূন্য, অর্থাৎ ৬২ শতাংশ শিক্ষকের পদ খালি। সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজে ৯৪টি পদের মধ্যে ৫২ জন কর্মরত, ৪৫ শতাংশ পদ খালি। সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজে ১০৩টি পদের মধ্যে ৩৯ শতাংশ পদ খালি।
মেডিকেল শিক্ষায় অ্যানাটমি, বায়োকেমিস্ট্রি, কমিউনিটি মেডিসিন, ফরেনসিক মেডিসিন, মাইক্রোবায়োলজি, প্যাথলজি, ফার্মাকোলজি ও ফিজিওলজি—এই আটটি বিষয়কে মৌলিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ১৬টি মেডিকেল কলেজে মৌলিক বিষয়ে শিক্ষকের তীব্র সংকট বিদ্যমান। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকের ২৭২টি পদের মধ্যে ১০০ জন কর্মরত আছেন, অর্থাৎ ১৭২টি বা ৬৩ শতাংশ পদ খালি। নওগাঁ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৌলিক বিষয়ের ১৪টি পদই খালি। মাগুরা মেডিকেল কলেজে ১৪টি পদের মধ্যে ১৩টি, সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজে ১২টি এবং হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজে ১১টি পদ খালি। পাবনা মেডিকেল কলেজে মৌলিক বিষয়ের ৫০ শতাংশ পদ খালি।
পাবনা মেডিকেল কলেজের দুজন ছাত্রী প্রথম আলোকে বলেন, ভর্তি হওয়ার আগে তাঁদের কোনো ধারণা ছিল না যে সরকারি মেডিকেল কলেজে এত সমস্যা। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় তাঁদের ‘আইটেম’ ও ‘কার্ড’ পরীক্ষা যেনতেনভাবে শেষ হয়। একটি আন্তর্জাতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন গবেষক নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘বাস্তবে আইটেম ও কার্ড পরীক্ষা ঠিকঠাক হচ্ছে না। এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ফাঁকিবাজি।’
পাবনা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. রুহুল কুদ্দুস জানান, কলেজটির বয়স ১৮ বছর হলেও আটটি মৌলিক বিষয়ের শিক্ষকসংকট রয়েছে। বায়োকেমিস্ট্রিতে ২০১৬ সাল থেকে শিক্ষক মাত্র একজন (তিনি নিজে), আর গাইনিতে কোনো শিক্ষকই নেই। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নাজমুল হোসেন এই সমস্যাকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে বলেন, অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, প্রণোদনার পরিমাণ বেতনের ১০০ শতাংশ করা, মৌলিক বিষয়ে পড়তে চাওয়া শিক্ষার্থীদের মাসে ২০ হাজার টাকা বৃত্তি দেওয়া এবং একই শিক্ষকের একাধিক মেডিকেলে পড়ানো ও অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার ব্যাপারে সক্রিয়ভাবে ভাবা হচ্ছে।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব মেডিকেল কলেজ মূলত ব্যক্তির ইচ্ছায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কোনো আইন বা বিধি মেনে নয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা প্রতিটি জেলায় একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দায়িত্ব পায় অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও বিভিন্ন সংকট দূর না করেই নতুন মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বরাষ্ট্র ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর জেলা মুন্সিগঞ্জে একটি সরকারি মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যা এখন থেমে গেছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীকেও একটি মেডিকেল কলেজ করার অনুমোদন দেওয়া হয়।
বিএনপি সরকারও পুরোনো পথে হাঁটছে এবং নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নরসিংদী মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হলেও প্রশাসনিক অনুমোদন পায় বিএনপি সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর। এই কলেজের জন্য জমি এখনো ঠিক হয়নি এবং আপাতত ১০০ শয্যাবিশিষ্ট নরসিংদী জেলা হাসপাতালে এর কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানা গেছে। সাধারণত যেকোনো মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য কমপক্ষে ২৫০ শয্যার একটি হাসপাতাল প্রয়োজন হয়। বিএনপি সরকার গঠন করার পরপরই ঠাকুরগাঁও মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেওয়া হয়, যার উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) চূড়ান্ত হওয়ার পথে। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে ঠাকুরগাঁও ও নরসিংদী মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি করার উদ্যোগ আছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ভোলা ও জয়পুরহাটে আরও দুটি মেডিকেল কলেজ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নাজমুল হোসেন জানান, তাঁরা মোট ১২টি জেলা থেকে আবেদন পেয়েছেন। নতুন মেডিকেল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে মূল্যায়নের জন্য স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীকে প্রধান করে সাত সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় ২০৪১ সাল পর্যন্ত মেডিকেল শিক্ষায় জনবল চাহিদা নিরূপণের কাজ চলছে, যার রিপোর্ট অক্টোবরের মধ্যে হাতে আসবে। এই রিপোর্টের ভিত্তিতে কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে। তবে ঠাকুরগাঁও ও নরসিংদীর পর আপাতত আর নতুন কোনো সরকারি মেডিকেল কলেজের অনুমোদন সরকার দিচ্ছে না।
জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, অধিকাংশ মেডিকেল কলেজ রাজনৈতিক কারণে হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর অনেক বছর পার হলেও অনেকগুলো পরিপূর্ণ মেডিকেল কলেজের রূপ নেয়নি। এসব কলেজের পক্ষে মান বজায় রেখে মেডিকেল শিক্ষা দেওয়া এবং মানসম্পন্ন চিকিৎসক তৈরি করা সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, দেশে চিকিৎসার মান নিয়ে জনমনে গভীর অসন্তোষের পেছনে এই কলেজগুলো দায়ী।
উল্লেখ্য, দেশে প্রথম মেডিকেল কলেজ ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৬ সালে। স্বাধীনতার আগে মেডিকেল কলেজ ছিল সাতটি। বর্তমানে দেশে মোট ১১০টি মেডিকেল কলেজ আছে, যার মধ্যে ৩৭টি সরকারি, ৭টি সশস্ত্র বাহিনীর অধীনে এবং ৬৬টি বেসরকারি।

















